জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণে ইসির পরিকল্পনা

একশ আসনে ইভিএম

  আসাদুর রহমান

১৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৮, ১০:৩১ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় পরিসরে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠেয় ওই নির্বাচনে তিনশ আসনের মধ্যে ১০০টির প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ইভিএমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইতোমধ্যে আড়াই হাজার ইভিএম মেশিন কেনা হয়েছে। বাকি ইভিএম মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। যদিও বিএনপি এ পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণের বিরোধিতা করে আসছে। ইসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভোটার। ৩শ আসনে প্রয়োজন হবে প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্র। ভোটকক্ষ হবে প্রায় ২ লাখ। সে হিসাবে ১শ আসনে ভোটকক্ষ থাকবে প্রায় ৬৭ হাজার। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছ থেকে ১২ হাজার ইভিএম নেওয়া হবে। বাকি ইভিএম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্র্বাচন সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। সেই সংশোধনীর মধ্যে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। চলতি সংসদের আগামী অধিবেশনে এ সংশোধনী পাস করা হবে বলে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা ইভিএম ব্যবহার করছি। এর গুণাগুণ তুলে ধরা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলসহ সবাই এটা পজিটিভলি নিলে সংসদ নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে।

বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা হয়ত ইভিএম মেশিনগুলো রেডি করতে পারব। তবে এটা পরিচালনার জন্য দক্ষ লোকবল প্রয়োজন। তা কতটুকু করা যায়। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের বিষয় আছে।

আইন সংশোধনসহ ইসির প্রস্তুতি বিষয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। দেখা যাক। পরিস্থিতি বুঝে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেছুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে আরপিও সংশোধন করতে হবে। সেটা সময়সাপেক্ষ। কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে সেই আলোকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সম্প্রতি ইসি সচিব বলেছেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হবে। ফল ভালো এলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হতে পারে। ইসি সচিবালয়ের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে ১০০ আসনে ভোটগ্রহণের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিশন ভেবে সিদ্ধান্ত নেবে।

ইসি সূত্র জানায়, আগামী সংসদ নির্বাচনের একশটি আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হবে। ওই ১০০ আসনের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ইভিএমে ভোটগ্রহণ হবে। এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছ থেকে ২ হাজার ৫৫৩টি ইভিএম মেশিন কেনা হয়েছে। প্রতিটি ইভিএমের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। শিগগিরই আরও ১০ হাজার ইভিএম কেনা হবে।

সদ্য সমাপ্ত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ৬টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হয়। বয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগলেও অনেকেই এ পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। এর আগে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটির ২টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হয়। সেখানে কোনো জটিলতার মুখে পড়তে হয়নি।

গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত রংপুর সিটির ১২৫ নম্বর ওয়ার্ডে একটি কেন্দ্রে নতুন ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হয়। ১৪১ নম্বর কেন্দ্রের ৬ বুথের মধ্যে একটি বুথে ১৫ মিনিট সমস্যা দেখা দিলেও অভিযোগ করেনি ভোটাররা। এছাড়া দলগুলোর পক্ষ থেকেও তেমন কোনো বিরোধিতা নেই। স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচনে ইভিএমের সফলতার পরেই জাতীয় নির্বাচনে বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের কথা ভাবছে ইসি।

এদিকে গতকাল সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কেন্দ্র দখল করে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ ওয়ার্ডে একজন মাত্র প্রার্থী থাকায় কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ।

ইসি সূত্র জানায়, গত ১৬ জুলাই রাজধানীর নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের ইভিএম ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে সবাইকে প্রশিক্ষিত করা হবে। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশের ভোটারদের সঙ্গে ইভিএমের প্রথম পরিচয় ঘটে। ওই নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। সে সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহায়তায় ৫৩০টি ইভিএম মেশিন কেনা হয়।

চট্টগ্রামের সাফল্যের পর নায়ায়ণগঞ্জের কয়েকটি ওয়ার্ডে, নরসিংদী পৌরসভা ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হয়। কাজী রকিব কমিশন দায়িত্বগ্রহণের পর রাজশাহী ও রংপুরে ছোট পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটিতে ইভিএম ব্যবহার করে বিতর্কের মধ্যে পড়ে ইসি। যন্ত্রে ত্রুটি দেখা দিলে ভোট স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যালটের মাধ্যমে ওই ইভিএম কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়।

২০১৪ সাল থেকে ইভিএমের কারিগরি ত্রুটি নিয়ে বুয়েট ও ইসির মধ্যে চিঠি চালাচালি ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বুয়েট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দেশীয় ব্যাটারি ব্যবহারের কারণেই ইভিএমগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। তাদের না জানিয়ে ওই ব্যাটারি ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন চুক্তির স্বার্থ লঙ্ঘন করায় ত্রুটিপূর্ণ ইভিএম মেরামতে আগ্রহও দেখায়নি বুয়েট। এসব কারণে বন্ধ হয়ে যায় ইভিএমের ব্যবহার। ওই দ্বন্দ্বের পর রকিব কমিশন বিদায়ের আগে ২০১৬ সালে নিজেদের উদ্যোগে ইভিএম তৈরিতে হাত দেয়। এর কারিগরি দিক ও ব্যবহার পর্যালোচনা করতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ১৯ সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়। কমিটির প্রতিবেদন পেয়ে নতুন ইভিএম ক্রয় ও ব্যবহার শুরু করে কেএম নুরুল হুদা কমিশন।

নতুন ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইভিএমে করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এর বিরোধিতা করে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি বলে আসছেÑ ইভিএম ফেরানোর উদ্যোগ দুরভিসন্ধিমূলক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ইসির সঙ্গে সংলাপেও ইভিএমের বিরোধিতার কথা জানায় বিএনপি। তবে সম্প্রতি সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের পর এ বিষয়ে জোরালো কোনো বক্তব্য রাখেনি দলটি।

অন্যদিকে ইসির সঙ্গে সংলাপে ইভিএমে ভোটগ্রহণের পক্ষে মত দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে