ব্যক্তিঋণে ঝুঁকছে মানুষ

  গোলাম রাব্বানী

২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসা করার জন্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনে দেশের সাধারণ মানুষ এখনো ধার করার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন জটিলতার কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে টাকা ধার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিকাজ, ব্যবসা, বাড়ি নির্মাণ, খাদ্য, বিবাহসহ আরও নানা কাজে মানুষ ঋণ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যাংক ও আর্থিক

প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে। ২০১০ সালে এসব খাতের বিপরীতে সরকারি ব্যাংক থেকে শতকরা ১.৫৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হলেও বর্তমানে তা ১.০৮ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে মহাজনভিত্তিক অতিরিক্ত সুদে ঋণ বা ধার নেওয়ার পরিমাণও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কমেছে গ্রামের মোড়ল বা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে এবং সুদে টাকা প্রদানকারীর কাছ থেকে টাকা ধার করার পরিমাণও। এর বদলে আত্মীয়স্বজন ও ক্ষুদ্র সমবায় সমিতি থেকে ঋণ বা ধার নেওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের সরকারি ব্যাংকগুলোতে গড়ে বাৎসরিক ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। যা মোট ঋণ বিতরণের মাত্র ১.০৮ শতাংশ। কিন্তু এর বিপরীতে প্রায় ১১.১৩ শতাংশ বা ১৩ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ধার নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ধার বা বাকি রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন মুদি দোকান ও এলাকাভিত্তিক ভ্যারাইটিজ স্টোর। সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ধার বা বাকি রাখা হচ্ছে এসব দোকানদারের কাছ থেকে। এই ধার বা বাকি রাখার প্রায় ৮৫ শতাংশই খাদ্য ক্রয় করার বিপরীতে করা হয়েছে।

তথ্য প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন এনজিও, ক্ষুদ্র সমবায় সংস্থার মাধ্যমে এ ধরনের ধার বা বাকি রাখার কার্যক্রম চলে যেগুলো বেশিরভাগই গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬ থেকে দেখা যায়, ওই বছর গ্রামে একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকা। এর বিপরীতে মাসিক ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ১৫৬ টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে আয়ের তুলনায় ৮০৩ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স, শহর থেকে গ্রামে টাকা পাঠানোসহ নানা কারণে গ্রামের লোকের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএ তসলিম বলেন, ব্যাংকে নানারকম তথ্যাদিযুক্ত নথি প্রদান, এসবের যাচাই-বাছাইয়ে জটিলতা অনেকেই এড়িয়ে যেতে চান। যার ফলে ধার করা বা বাকি রাখার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই ধার করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বদলে অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ বা ধারের দিকে ঝোঁকা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। কেননা এর আর্থিক বিবরণ, শুল্কায়ন আরোপিত হয় না।

অধ্যাপক এমএ তসলিম বলেন, বাংলাদেশে দিন দিন ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এর কোনো সুফল আসেনি। এর প্রমাণ হিসেবেই ব্যক্তির কাছ থেকে ধার বা বাকি রাখার প্রবণতা বেড়েছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাকি বা ধার করা একট প্রচলিত পদ্ধতি। মহাজন বা মোড়লের কাছ থেকে চড়া সুদের বদলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে আসা অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ব্যাংকের তারল্য সংকট কমে যাওয়া ছাড়াও নানারকম কেলেঙ্কারির কারণে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যক্তির কাছ থেকে ধার নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের ধারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কাগজপত্রের চুক্তি বা তথ্যাদি না থাকায় এক ধরনের দুষ্টুচক্রও তৈরি হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে