একজন শেখ হাসিনা

সাগরসমান অর্জন

  আলী আসিফ শাওন

২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৮, ১৩:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো; আগুনের ছাই থেকে উঠে এসেও নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। অথচ এ দেশেই একদিন আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন। নিজেও হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকবার। এত কিছুর পরও মাটিকে ভালোবেসে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে পথ চলছেন তিনি।

এরই মধ্যে টানা ১০ বছরের শাসনামলে একটি মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে তুলে বাস্তবায়ন করেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন। স্বাধীনতার চার দশক পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতিকে করেছেন কলঙ্কমুক্ত। মাথা নত করেননি দেশি-বিদেশি অজস্র চক্রান্তের কাছে। উল্টো সাহসিকতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বগুণে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেয়েছেন শতাধিক পুরস্কার, অর্জন ও উপাধি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এখন বিশ্বনেত্রী। তাই আজ বিকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন অনুকরণীয় নেতৃত্ব। খাদ্যনিরাপত্তা, শান্তিচুক্তি, যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, সমুদ্র বিজয়, নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশ বিজয়, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নতি, স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় সমুজ্জ্বল তিনি। বিপথগামী একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে বাবা-মা, ভাইসহ পুরো পরিবার নিহত হওয়ার পর নির্বাসনে ছিলেন ছয় বছর। সব বাধা উপেক্ষা করে ও জীবনবাজি রেখে দেশে ফেরেন ১৯৮১ সালে। তার এই ফিরে আসাটা ছিল গণতন্ত্রের মুক্তি, দেশের উন্নয়ন ও প্রগতির নবস্বপ্ন। নিজের নীতি ও আদর্শকে সমুন্নত রাখার এই যাত্রায় আততায়ীর হামলার শিকার হয়েছেন ১৯ বার। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়াটা ছিল নতুন জীবন।

সত্তরোর্ধ্ব শেখ হাসিনার হাসি এখনো প্রাণবন্ত। সোনার বাংলা থেকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে বিদায় করে বাবার স্বপ্নপূরণের জন্যই যেন তার ছুটে চলা। আশির দশকে যেমন তিনি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন দলকে, তেমনি একটি অনুন্নত দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দীর্ঘ তিন যুগ ধরে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ক্ষমতায় এনেছেন তিনবার। তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের দিনবদলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬৪টিতেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট জয়লাভ করে। শুরু হয় রূপকল্প ২০২১-এর পথযাত্রা। জাতীয় প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় রেকর্ড ছাড়ায় অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে। নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়ে বিচার করেন চিহ্নিত রাজাকার-আলবদর নেতাদের। যদিও শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের যারা একসময় মন্ত্রী-এমপি ছিলেন, তাদের বিচারকে প্রভাবিত করতে বহির্বিশ্বের নানা চাপ ছিল।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের অনেকগুলো দলই অংশ নেয়নি। এ জন্য অনেকেই এটাকে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ বলে থাকেন। তবে আওয়ামী লীগ নেত্রীর মতে, দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ওই নির্বাচনের বিকল্প ছিল না। চলতি মেয়াদসহ তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। বিশ্বের কাছে একটি রোলমডেল। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনেও তিনি বিশ্বনেতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি চুক্তি। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ এখনো কম-বেশি পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালিদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বিভিন্ন জটিলতায় সেই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও এখন আর পাহাড়ে আগের মতো যুদ্ধের ডামাডোল নেই। শেখ হাসিনার আমলেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর থেকেই দিবসটিকে যথাযথ মর্যাদায় পালন করছে জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলো। ২০০৯ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য হেগের সালিশি আদালতে নোটিশ করে। এর পথ ধরেই ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার রায় পায়। এতে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের রাষ্ট্রীয় সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল মহীসোপান এলাকায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। শেখ হাসিনার চলতি মেয়াদে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি কার্যকর করায় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হয়। ৬৮ বছর পর নাগরিক হিসেবে পরিচয় পায় ছিটমহলবাসী।

নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন শেখ হাসিনা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা তাকে সম্মাননা দিয়েছে। চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট) ডিগ্রি প্রদান করে। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য একই বছর পেয়েছেন ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যের টেলিভিশন ‘চ্যানেল ফোর’ তাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ আখ্যা দেয়, দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস আখ্যা দিয়েছে ‘স্টার অব দি ইস্ট’।

২০১৬ সালে শেখ হাসিনাকে ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার’ ও ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার প্রদান করে জাতিসংঘ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরষ্কার-২০১৫ ‘চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ’ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য পান ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’। রাজনীতিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনের জন্য পান ওম্যান ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড। নারী ও শিশু শিক্ষা উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৪ সালে শেখ হাসিনাকে ‘শান্তিবৃক্ষ পদক’ পুরস্কারে ভূষিত করে ইউনেস্কো। সমুদ্রসীমা জয়ের জন্য ২০১৪ সালে ‘সাউথ সাউথ’ পুরস্কার দেয় জাতিসংঘ।

এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন অবদানের জন্য ‘মান্থন অ্যাওয়ার্ড’, ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’, ‘কালচারাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড’, ‘গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড’, ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’, জাতিসংঘের ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অ্যাওয়ার্ড’, ‘ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পদক-২০০৯’, ‘পার্ল এস বাক পদক’, ‘ডক্টরস অব হিউম্যান লেটার্স’, ‘সেরেস পদক’, ‘মাদার তেরেসা পদক’, ইউনেস্কোর ‘ফেলিং হুফে বইনি শান্তি পুরস্কার’, ‘নেতাজি মেমোরিয়াল পদক-১৯৯৭’সহ বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ও সম্মাননা পেয়েছেন।

পাশাপাশি শেখ হাসিনা তার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের কারণে বিভিন্ন স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস সাময়িকীর দৃষ্টিতে বিশ্বের ক্ষমতাধর শত নারীর তালিকায় ৩৬তম এবং নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরিপে ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করেন।

রাষ্ট্র পরিচালনার শত ব্যস্ততার পাশাপাশি বাঙালি নারীর মতো ঘরসংসারও দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন শেখ হাসিনা। ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও নানা ও মায়ের আদর্শ ধারণ করেন। তার প্রয়াত স্বামী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন একজন স্বনামধন্য পরমাণুবিজ্ঞানী। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময়ে নাতি-নাতনিদের সঙ্গেও একান্তে সময় কাটান শেখ হাসিনা। ইসলাম ধর্মের অনুশাসন প্রতিপালন করা এই নেত্রীর দিন শুরু হয় ফজরের নামাজের মধ্য দিয়ে। সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে দিনের পরিকল্পনা শুরু করেন তিনি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে