মিরপুরে হামলা করল কারা

ফের আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা

  ইউসুফ সোহেল

০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৮, ০৯:৫০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়Ñ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি এমন নির্দেশ ছিল সরকারের। তার পরও বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর মিরপুরে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। তাদের বেধড়ক লাঠিপেটাসহ লাঞ্ছিত করে পুলিশ ও একদল যুবক। লাঠিসোটা-রড নিয়ে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে তাদের। মিরপুর ১৩ ও ১৪ নম্বরের মধ্যে বিআরটিএ থেকে কাফরুল থানা হয়ে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের গেট পর্যন্ত সড়কে-ফুটওভার ব্রিজে তারা যে শিক্ষার্থীকেই পেয়েছে তাকেই মারধর করেছে। 
এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল রাজধানীর ধানম-ির সাত মসজিদ রোডে আয়োজিত মানববন্ধন শেষে ফেরার সময় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন ইউল্যাবের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিলে হামলাকারীরা গেট ভাঙারও চেষ্টা করে। অন্যদিকে হামলার ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন অনলাইন পোর্টাল প্রিয়ডটকমের সাংবাদিক প্রদীপ দাস। 
মিরপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা কারণ ছাড়াই কাফরুল থানায় হামলার চেষ্টা করে এবং পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। তাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বহিরাগতদের হটিয়েছে পুলিশ। ওই বহিরাগতরা কারা, তারা শিক্ষার্থীদের মেরেছে কিনা, তা জানে না 


পুলিশ।
তবে হামলার শিকার শিক্ষার্থীরা ও কিছু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, পুলিশের সঙ্গে এক হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছে স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। 
জানা গেছে, সরাসরি এ হামলায় অংশ নেন কাফরুল থানার ১৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা আলমগীর ও কর্মী ফাহাদ ছাড়াও এই ইউনিটের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা যুবলীগের নেতা এসএম জাহিদের অনুসারী। এ ছাড়াও মিরপুর শেওড়াপাড়া থেকে এসে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের কিছু নেতাকর্মীও অংশ নেন হামলায়। আর নেপথ্যে থেকে ঘটনার কলকাঠি নাড়েন কাফরুল থানার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন আহমেদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ইসমাইল হোসেন, কাফরুল থানা আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন নেতা। তারা সবাই কাফরুলের ইব্রাহিমপুরের বাসিন্দা। 
অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে কাফরুল থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহিন আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি ৪ দিন ধরে সাভারে অবস্থান করছি। তা হলে কী করে আমি এই ঘটনায় জড়িত হব? আমার সুনাম নষ্ট করার জন্য একটি পক্ষ হয়তো এই অপপ্রচার করছে।’ 
মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালেও পুলিশ স্কুলের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে নানা উপদেশ দিয়েছি। বলেছি, ইউনিফর্ম পরিহিত ছাড়া কেউ যেন তাদের সঙ্গে ভিড়তে না পারে। অন্য এলাকা থেকে আসা কলেজের শিক্ষার্থীদের বলেছি তারা যেন মিরপুর থেকে গিয়ে তাদের কলেজের সামনে দাঁড়ায়। যাদের আমি উপদেশ দিয়েছি, তাদের ওপর হামলায় জড়িত থাকতে পারি?’ 
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার কাফরুল থানা আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি তিনি।          
পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত হামলার শিকার আহত এক কলেজছাত্র বলে, বিকালে মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছিল। এ সময় পুলিশ হঠাৎ এসে লাঠিপেটা শুরু করে। পরে তাদের সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগও যোগ দেয়। মিরপুরের ১০, ১৩ এবং ১৪ নম্বর এলাকার সড়কে ধাওয়ার পর লাঠিপেটায় আন্দোলনরত অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া সেদিনের ঘটনার বেশ কিছু ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ঘটনার সময় বেশ কয়েকজন যুবক রড ও লাঠি নিয়ে ঘোরাফেরা করছে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করছে। পুলিশও ছিল সশস্ত্র অবস্থায়। একটি ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, পুলিশ ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িতে শিক্ষার্থীদের পেটাচ্ছে। পুলিশ বেস্টনীর মধ্যেই একজন ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরা ভেঙে দিচ্ছে এক যুবক। এক সাংবাদিককে পেটাতেও দেখা গেছে কয়েকজন যুবককে।
পুলিশের এমন ভূমিকার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কেউই বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ হামলার প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার সকালে মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে মানববন্ধন করেন মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শতাধিক অভিভাবক। তারা বলেন, বাচ্চাদের আন্দোলন যৌক্তিক। গতকাল আমাদের বাচ্চাদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে আমরা শঙ্কিত। তাদের ওপর হামলা হলে আমরা ঘরে বসে থাকব না।

ইউল্যাব শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, সাংবাদিককে মারধর
নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল রাজধানীর ধানম-ির সাত মসজিদ রোডে আয়োজিত মানববন্ধন শেষে ফেরার সময় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন ইউল্যাবের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিলে হামলাকারীরা গেট ভাঙারও চেষ্টা করে। অন্যদিকে হামলার ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন অনলাইন পোর্টাল প্রিয়ডটকমের সাংবাদিক প্রদীপ দাস। এ সময় ধানম-ির সাত মসজিদ রোডে অবস্থিত প্রিয়ডটকমের অফিসেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে একদল যুবক। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানম-ি ৭/এ সড়কে এ ঘটনা ঘটে। তবে কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে তা জানা যায়নি। 
ইউল্যাবের শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ জানান, নিরাপদ সড়কের দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধন শেষে রিকশায় করে যাওয়ার সময় কয়েক যুবক তাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। এর পর ক্যাম্পাসের সামনে থাকা ১৫ শিক্ষার্থীর ওপর চড়াও হয় তারা। ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় হামলাকারীরা গেট ভাঙারও চেষ্টা করে।
শিক্ষার্থীরা জানান, সকালে মানববন্ধনে থাকাকালীন কয়েক যুবক মোটরসাইকেল দিয়ে ঘুরে ঘুরে তাদের ছবি তুলে নেয়। সন্ধ্যায় এসে তারাই হামলা চালায় শিক্ষার্থীদের ওপর। 
প্রিয় ডটকমের হেড অব নিউজ রফিকুল ইসলাম রঞ্জু বলেন, আমাদের অফিসের পাশে রাস্তায় ইউল্যাবের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে একদল যুবক। মারধরের সে ঘটনার ছবি তুলতে গেলে আমাদের প্রতিবেদক প্রদীপ দাসের ওপর ওই যুবকরা চড়াও হয়। পরে কয়েকজন সহকর্মী তাকে বাঁচাতে গেলে তাদেরও মারধরের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে আমরা দৌড়ে এসে নিউজরুমে ঢুকি। ততক্ষণে অফিসের প্রবেশমুখে কাঁচের দরজা ভাঙচুর করে চলে যায় হামলাকারীরা। বিষয়টি ধানম-ি থানা পুলিশকে জানানো হলেও তাদের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ধানম-ি থানার ওসি মো. আব্দুল লতিফ জানান, প্রিয়ডটকম নামে একটি অনলাইন পোর্টালের সংবাদ কর্মীদের ওপর হামলার সঙ্গে কারা জড়িত তা জানা যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে