sara

ফোর ও থ্রিজি সেবা বন্ধ

হার্ডলাইনে যেতে পারে সরকার

  আলী আসিফ শাওন

০৫ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৮, ১০:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরোনো ছবি
রাজধানীতে বাসচাপায় দুই স্কুলশিক্ষার্থী নিহতের পর সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের ঘোষিত ৯ দফা দাবির সবগুলোই মেনে নেওয়ার দাবি করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। তার পরও কেন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

আন্দোলনের আড়ালে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সরকারবিরোধী মহল ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে বলে মনে  করেন তারা। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেওয়ার প্রমানও পেয়েছে গোয়েন্দারা। গুজব ঠেকাতে গতকাল সন্ধ্যা থেকে মোবাইল ইন্টারনেটের ফোরজি ও থ্রিজি সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকে আর দীর্ঘায়িত করতে না দিয়ে দু-এক দিনের মধ্যেই দেশের সড়ক যোগাযোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবার হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা জানিয়েছেন, শিশুদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তাদের সব দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সে কারণে টানা ৬ দিন ধরে চলমান আন্দোলনে নরমপন্থা দেখানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির বেশিরভাগ মেনে নেওয়ার পর ভাবা হয়েছিল, শুক্র-শনিবার থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ছুটির দিন শুক্রবার ও গতকাল শনিবার আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নেওয়ায় সেই ভাবনায় ছেদ পড়ে।

উদ্ভত পরিস্থিতিতে দফায়-দফায় বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তাদের ধারণা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আড়াল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেষ্টা করছে। তাই তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করা হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গতকাল বিকালে আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ৯ দফা দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। তার পরও কেন আন্দোলন করছে এটা বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত শিশুবান্ধব একজন মানুষ।

শিক্ষার্থীদের দাবি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো মেনে নিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি দু-একটি দাবি যেগুলো বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন, সে ব্যাপারেও তিনি যথেষ্ট আন্তরিক। এর পরও অভিভাবকরা কেন তাদের সন্তানদের আন্দোলনে পাঠাচ্ছেন, তার উত্তর জানা নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সরকারবিরোধী মহল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সব অর্জনে কালিমা লেপনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

দু-এক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এমন আশাবাদ জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেন, আন্দোলনে রাজনৈতিক অপশক্তি যে মদদ দিচ্ছে, তা আমরা খুব কাছ থেকে দেখছি। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে যাব। শিক্ষার্থীরা আস্তে আস্তে ঘরে ফিরতে শুরু করছে। আশা করি দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, আশা করছি রবিবারের মধ্যে আন্দোলন অনেকটা থেমে আসবে এবং সোমবারের মধ্যে সারাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতিপক্ষ নয়। তাদের ৯ দফা দাবি আন্তরিকতার সঙ্গে মেনে নিয়েছে সরকার। দাবি মানার পর তাদের এই আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা আর থাকে না। এর পরও যারা রাস্তায় নেমে অরাজকতা করতে চাইবে, দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টানা ৬ দিনের মতো রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের স্লোগান, ফেস্টুন, ব্যানার ও ফেসবুকের মাধ্যমে যে ৯ দফা দবির কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে ১ নম্বর দাবি ছিল- জাবালে নূরের ঘাতক চালককে ফাঁসি দিতে হবে। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত চালকের বিরুদ্ধে ফাঁসির শাস্তি আইনে যুক্ত করতে হবে। ওই বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন, দ্রুত এ মামলার বিচার সম্পন্ন করা হবে। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে অপরাধজনিত হত্যার ধারা সংযোজন করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা মন্ত্রিপরিষদে তোলা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে নতুন আইন শিগগিরই সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের ২ নম্বর দাবি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের দুঃখ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। এরই মধ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী নিহত শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে তার হাসির ব্যাখ্যা দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন।

৩ নম্বর দাবি শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করে চলাচলে বিকল্প ব্যবস্থা করা। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী দুর্ঘটনাস্থলে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস নির্মাণে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া শহীদ রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজকে ৫টি বাসও হস্তান্তর করা হয়েছে গতকাল।

শিক্ষার্থীদের ৪ নম্বর দাবি প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিডব্রেকার নির্মাণ করা। এরই মধ্যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে স্পিডব্রেকার নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৫ নম্বর দাবি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। এরই মধ্যে নিহত দুজনের পরিবারকে ২০ লাখ করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

৬ নম্বর দাবি শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। এরই মধ্যে ট্রাফিক পুলিশকে এ নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে।

৭ নম্বর দাবি শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করা। এ দাবির ব্যাপারে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। সরকার এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজও শুরু করেছে।

৮ নম্বর দাবি রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরই মধ্যে লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৯ নম্বর দাবি বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসে অতিরিক্ত যাত্রী ও যততত্র লোক ওঠানো ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের ৮ ও ৯ নম্বর দাবির সহায়ক হিসেবে আজ রবিবার থেকে সারাদেশে ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের চেতনা বুঝতে পেরেছি, এখন থেকে কেউ সড়ক আইন ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি দলের নেতারা আরও জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির সবগুলোই মেনে নিয়েছে সরকার। এখন তাদের ক্লাসে ফিরে যাওয়া উচিত। আন্দোলনে সফলতা পাওয়ার পরও রাস্তা আটকে রেখে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। ইতোমধ্যে সারাদেশের যেসব জেলায় আন্দোলন হয়েছে, সেসব জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই। গতকাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি এমপি জানান, তিনি চাঁদপুরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ বিষয়ে বলেন, সরকার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। তাই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়া উচিত। দিনের পর দিন রাস্তাঘাট বন্ধ করে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা আন্দোলনের কোনো পদ্ধতি হতে পারে।

ফোর ও থ্রিজি সেবা বন্ধ ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে ঢাকার ধানমণ্ডিতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘাতের পর মোবাইল ইন্টারনেটের ফোরজি ও থ্রিজি সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মোবাইল অপারেটরগুলোর একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ইন্টারনেটের গতি ১.২৮ কেবিপিএসে নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে তারা এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন। তারা জানান, ১.২৮ কেবিপিএসে ফেসবুকে ছবি আপলোড করা সম্ভব হবে না। অন্যান্য ওয়েবসাইট দেখতেও গ্রাহকদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে