জাতীয় ঐক্যের পর যৌথ আন্দোলন

  হাসান শিপলু ও নজরুল ইসলাম

১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১০:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘গণতন্ত্র রক্ষার’ মেনিফেস্টোতে যুগপৎ আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলসহ কয়েকটি রাজনৈতিক জোট। এর আগে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের ডাকা সমাবেশে সরকারবিরোধী ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রকাশ্যে রূপ নেবে বলে উদ্যোক্তারা আশা করছেন।

এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর যুক্তফ্রন্ট এবং সিপিবি-বাসদের ৮-দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন হয়েছে। ড. কামালের নেতৃত্বাধীন আরেকটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট আগে থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে আছে।

জানা গেছে, জোটবদ্ধ দলগুলোর দাবি এক ও অভিন্ন। তা হলো আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো। এ দাবিতে জোটগুলোর মধ্যে প্রায়ই বৈঠক হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বেশ আলোচনা আছে। ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে জোটগুলো এক মঞ্চ থেকে সরকারের কাছে ‘কঠোর’ বার্তা দিতে চায়। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকায় বড় শোডাউন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, সবার সঙ্গে ঐক্য হয়ে গেছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে সবাই আসবে। জনগণ জেগে উঠেছে। শিগগিরই দেশে পরিবর্তন আসবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল চলমান অবস্থা থেকে মুক্তি চায়, সবাই পরিবর্তন চায়। যেখানে সবার চাওয়া এক ও অভিন্ন, সেখানে আন্দোলন যে কোনো ফরম্যাটে হতে পারে।

জানা গেছে, বৃহত্তর এই প্ল্যাটফর্ম কিংবা জাতীয় ঐক্যের নেতৃত্ব কে থাকবেন এই প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ দিতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কোনোভাবে যাতে ঐক্য প্রক্রিয়া ব্যর্থ না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় ঐক্য ও যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ইস্যুতে পাঁচ দফা দাবির একটি খসড়া করা হয়। খসড়ার মধ্যে রয়েছে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তি এবং নতুন করে মামলা না দেওয়া; সব রাজনৈতিক দলের আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন; সংসদ ভেঙে দেওয়া; নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতি বাতিল।

এসব দাবি নিয়ে বিএনপি নেতারা মিত্র রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে। তাদের দাবি, এ পাঁচটি দাবির সঙ্গে সবাই একমত। এ নিয়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার অন্যতম উদ্যোক্তা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সিপিবি-বাসদসহ সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা বলেন, সবাই এই সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। কিন্তু সন্দেহ রয়েছে বি. চৌধুরীকে নিয়ে। কারণ তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরীর সঙ্গে সরকারের কোনো এক নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে বি. চৌধুরী তার সিদ্ধান্তে কতটুকু স্থির থাকতে পারবেন, এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

ওই নেতারা বলেন, জাতীয় ঐক্য করতে গেলে তার প্রধান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন বি. চৌধুরী অথবা ড. কামাল হোসেন। বি. চৌধুরীকে নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। ড. কামালকে প্রধান করলে বি. চৌধুরীর অনুসারীরা বেঁকে বসতে পারেন।

কয়েক দিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ড. কামাল। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ভোটাধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ডাক দিচ্ছেন তিনি। বুধবার ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠক হয়েছে।

জানা গেছে, জামায়াতকে নিয়ে জোট গঠনে অনেকের আপত্তি আছে। তবে যুগপৎ আন্দোলনের ক্ষেত্রে তা সমস্যা হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ জামায়াত ২০-দলীয় জোটের শরিক। জামায়াতকে রাজনৈতিক শক্তি বিবেচনায় এনে উদ্যোক্তাদের অনেকেই তাদের রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমরা কয়েক বছর ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে তৃতীয় রাজনৈতিক জোট গড়ার চেষ্টা করে আসছি। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করায় সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রতি আমরা জোর দিয়েছি।

বিএনপি নেতারা জানান, বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম গড়তে লন্ডন থেকে মূল কাজ করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটি কাজ করছে। রোজার ঈদের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে দুই নেতা একান্তে কথা বলেন। বিএনপি মহাসচিবের উপস্থিতিতে সেখানে একটি অনুষ্ঠানে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্যের পক্ষে জোরালে বক্তব্য রাখেন।

সম্মিলিত শক্তিকে জোরদার করতে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গণসংযোগ, জনসভা ও গণসমাবেশ করার কর্মসূচি নিয়েছে যুক্তফ্রন্ট। বুধবার অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে তার বারিধারার বাসভবনে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

বিএনপি ও তার সমমনা মিত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মধ্যে ২০ দলের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো মৌখিকভাবে এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির ব্যাপারে একমত হয়েছে। জামায়াতের ব্যাপারে বিএনপির নতুন মিত্রদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কারণ নতুন রাজনৈতিক মিত্ররা জোট করবে বিএনপির সঙ্গে, ২০ দলের সঙ্গে নয়। সে ক্ষেত্রে ২০ দলে কারা থাকল, এ নিয়ে নতুন মিত্রদের এখন পর্যন্ত কোনো আপত্তি নেই। তবে জামায়াত যদি জোটে থাকতে না চায়, তাদের বাধাও দেওয়া হবে না।

বিএনপি সূত্র বলছে, বিএনপি সমর্থক কয়েকজন বুদ্ধিজীবী এ প্ল্যাটফর্ম তৈরির নেপথ্যে কাজ করছেন। তাদের একজন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, এখন সবার বিপদ। এই বিপদে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সে বিবেচনায় এই ঐক্য গড়তে সবাই রাজি হয়েছে।

বিএনপির সূত্র জানায়, একটি জাতীয় কনভেনশন করার ব্যাপারেও চিন্তাভাবনা রয়েছে দলটির। এটি নির্ভর করছে আগামী দুই মাস রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হয় তার ওপর।

এর আগে ২০১২ সালে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। সে সময় দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওই প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন। কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি, গণফোরাম, বিকল্পধারা, জাসদ (রব), নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ গুলশানে জঙ্গি হামলার পর খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে এই পরিস্থিতিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটিও সম্ভব হয়নি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে