ঈদযাত্রায় পথেঘাটে ভোগান্তি

  আমাদের সময় ডেস্ক

১৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১০:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

আর তিনদিন পর কোরবানির ঈদ। কোরবানির কারণেই মানুষ একটু আগেভাগে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় গতকাল শুক্রবার অনেকেই শামিল হন ঈদযাত্রায়। আনন্দ নিয়ে সপরিবারে যাত্রা শুরু করলেও রাজধানী থেকে বেরিয়েই তাদের মহাসড়ক এবং ফেরিঘাটে তীব্র যানজটে পড়তে হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা গাড়িতে অবস্থান করে পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি। এতে ম্লান হয়েছে ঈদযাত্রার আনন্দ।

ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-আরিচাসহ বিভিন্ন মহাসড়কে গতকাল সকালের দিকেই যানজট ছিল বেশি। বিকালের দিকে মাত্রা কিছুটা কমে আসে। আমাদের সময়ের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী গাড়ি বিকল হয়ে পড়া, মহাসড়কে সরু সেতুর কারণে টোল প্রদানে বিলম্ব এবং ওজন স্কেল পরিচালনায় ধীরগতিই ছিল গতকাল মহাসড়কগুলোতে গাড়িজট লাগার মূল কারণ। এ ছাড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌরুটের একটিতে তীব্র নাব্যতা সংকট ও অন্যটিতে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ায় ফেরিঘাটে সৃষ্টি হয় যানজট।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারের কর্মীরা জানান, ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী বাসে জট পড়েছে। পদ্মায় নাব্যতা সংকটের কারণে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় দক্ষিণের বিভিন্ন গন্তব্যের বাসের যাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের খবর মিলেছে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত গতকাল শুক্রবার গাড়ি চলেছে থেমে থেমে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিনটি সেতু এখনো দুই লেনের। সরু সেতুর কারণে গত কয়েক বছর ধরেই দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। তবে উত্তরবঙ্গে বাস চলাচলে তুলনামূলক ঝক্কি কম। অবশ্য বঙ্গবন্ধু সেতুর পরে বগুড়া পর্যন্ত সড়ক খারাপ হওয়ায় ওই অংশে বাস ধীরগতিতে চলছে। এ ছাড়া আমিনবাজারে গরুর হাট বসায় দু-তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে ঢাকায় ঢুকতে।

গতকাল রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে।

একই দিনে সাভারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, এবার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করতে মহাসড়কগুলোতে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যানজটের আশঙ্কা রয়েছে এমন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ যানজট নিরসনে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। আইজিপি আশ্বস্ত করে বলেন, পশুবাহী কোনো গাড়ি রাস্তায় আটকানো যাবে না।

সোনারগাঁও প্রতিনিধি জানান, মেঘনা সেতুর টোল প্লাজায় ওজন স্কেলে ভারী যানবাহনের ওজন পরিমাপ ও টোল আদায় করতে দেরি হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনা সেতু থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিনিয়তই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

গতকাল সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মেঘনা সেতু এলাকা, মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা, লাঙ্গলবন্দ, কেওঢালা, মদনপুর ও কাঁচপুর এলাকায় যানজট ছিল।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, রাত তিনটার দিকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচরে ঢাকাগামী একটি রডবাহী ট্রাকের চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। এতে ট্রাকটি উল্টে গেলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর গজারিয়া হাইওয়ে পুলিশ ট্রাকটি সরিয়ে নেয়। দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে যানজট সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রামগামী সোহাগ পরিবহনের চালক কামাল হোসেন জানান, সকাল ৭টায় ঢাকা থেকে বাস ছেড়ে ১২টায় মেঘনা সেতু এলাকায় এসেছি। যানজট না থাকলে এক ঘণ্টায় এ স্থানে এসে পৌঁছতে পারতাম।

কুমিল্লাগামী তিশা পরিবহনের চালক শাহ জাহান মিয়া জানান, মেঘনা সেতুর টোল প্লাজায় যানজটে পড়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে বসে থেকে যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

চট্টগ্রামগামী হানিফ পরিবহনের যাত্রী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম জানান, সরকারি ছুটির দিনে যদি মহাসড়কে এমন অবস্থা হয়, তা হলে ঈদে ঘরমুখী মানুষের কী অবস্থা হবে?

অভিযোগ করে তিনি বলেন, টোল প্লাজা ও ওজন স্কেলে এত অব্যবস্থাপনা, সরকার কি এসব দেখে না? তা ছাড়া উল্টো পথে যানবাহন চলাচল করছে। মহাসড়কের কোথাও পুলিশ নেই।

কাঁচপুর হাইওয়ে থানাপুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম আলী জানান, মেঘনা সেতুর টোল প্লাজায় টোল আদায় করতে দেরি ও ওজন স্কেলে দেরি হওয়ার কারণে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। পুলিশ মহাসড়কে যানজট নিরসনের চেষ্টা করেও সফল হচ্ছে না।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে গতকাল সকালের দিকে ঢাকা টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে থেমে থেমে চলে যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়েন ঈদে ঘরমুখী যাত্রীরা। তবে দুপুরের পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ভোর থেকে মহাসড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এ যানজট সৃষ্টি হয়। যানজটের মাত্রা বেশি ছিল ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী, চেরাগআলী, কলেজ গেট, গাজীপুরা, বড়বাড়ি, বোর্ডবাজার ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায়। চালকদের ওভারটেকিং প্রবণতার কারণেও যানজটের মাত্রা বেড়ে যায়। এ ছাড়া চৌরাস্তায় কাভার্ডভ্যান চাপায় নারী নিহত ও হোতাপাড়া এলাকায় শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে।

এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের খাড়াজোড়া থেকে চন্দ্রা ও আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকায় ছিল যানজট। সড়কে পণ্য ও পশুবাহী ট্রাকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং খাড়াজোড়া এলাকায় একটি ট্রাক বিকল হওয়ায় এই মহাসড়কে সকাল থেকে যানজট সৃষ্টি হয়। ট্রাফিক পুলিশের শতাধিক সদস্য বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে যানজট নিরসনে কাজ করছেন।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের প্রমত্তা পদ্মায় নাব্যতা সংকটের মুখে ফেরি চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরেই নৌরুটে এ অবস্থা চলছে। এর ফলে শিমুলিয়া ঘাটে পারের অপেক্ষায় থাকা যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন পড়ছে প্রতিদিন। গতকাল শুক্রবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকের পাশাপাশি প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়তে থাকে দুই ঘাটে। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ঈদে ঘরমুখী মানুষদের চাপ।

যাত্রীসাধারণের অভিযোগ, প্রতিবছরই এই সময়ে পদ্মায় নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। এতে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাওয়া ঘাটের ট্রাফিক অফিসার এইচএম সিদ্দিকুর রহমান জানান, শুক্রবার বিকালে ঘাটে পারের অপেক্ষায় ছিল ৪ শতাধিক যানবাহন। এর মধ্যে ৮০টির ওপরে প্রাইভেট কার, ১শ কাভার্ডভ্যান, ১২০টি মিনি ট্রাক, দেড় শতাধিক বড় ট্রাক রয়েছে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, তীব্র স্রোতের কারণে গত কয়েক দিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটের ফেরি চলাচল। স্্েরাতের বিপরীতে ফেরিগুলোকে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে চলতে হচ্ছে। এতে করে পাটুরিয়া ঘাটে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যানবাহনের সারি কখনো কখনো দুই থেকে তিন কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। দুপুরের দিকে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুপুর সোয়া ১২টা থেকে বিকাল পর্যন্ত পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে সব মিলিয়ে ৫ শতাধিক যানবাহন পারের অপেক্ষায় ছিল। তবে সন্ধ্যার দিকে যানবাহনের চাপ কমে যায়।

পাটুরিয়া ফেরিঘাট শাখার (বাণিজ্য) ব্যবস্থাপক সালাউদ্দিন আহমেদ জানান, সকাল থেকে ঘাট এলাকায় যানবাহনে চাপ ছিল। তবে পর্যাপ্ত ফেরি থাকায় সন্ধ্যার দিকে যানবাহনগুলোকে সুষ্ঠুভাবে পার করা হয়েছে। তবে রাতের দিকে এই রুটে যাত্রীবাহী বাসের চাপ বাড়বে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে