ভ্রাতৃ হত্যা আর কত

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি ও রফিকুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি

১৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৯:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ে খুনখারাবি থামছে না। একের পর এক ‘টার্গেট কিলিং’-এর শিকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। এ ক্ষেত্রে ঘাতক হিসেবে নিজেদের সংগঠনগুলোকেই দায়ী করছেন তারা। সর্বশেষ গতকাল শনিবারও আধিপত্য বিস্তারের প্রাণসংহারী লড়াইয়ে রক্ত ঝরেছে খাগড়াছড়ি শহরে। পাহাড়ি সশস্ত্র দুটি গ্রুপের মধ্যে গতকাল দুই দফায় প্রচণ্ড গোলাগুলিতে অন্তত ৭ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। খাগড়াছড়িতে প্রকাশ্যে একদিনে এতজন হতাহতের ঘটনা এটাই

প্রথম। সব মিলিয়ে চলতি বছরের গত সাড়ে আট মাসে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যে সংঘাতে রাঙামাটিতে ২৪ জন ও খাগড়াছড়িতে ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছে, এমন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আর কত? আর কত দীর্ঘ হবে মৃত্যুর মিছিল? মূলত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার, মতের ভিন্নতা আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ি সংগঠনগুলো। পাল্টা প্রতিশোধের নামেও খুনখারাবির ঘটনা ঘটছে।

গত ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংস্কারবাদী জেএসএসের সহসভাপতি শক্তিমান চাকমাকে হত্যা এবং পরদিন ৪ মে তার শেষকৃত্যে অংশ নিতে যাওয়া গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ৫ জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা ও ৮ জনকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার জন্য দল দুটি প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফকে দায়ী করে আসছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ৬ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই সাড়ে তিন মাসের মাথায় গতকাল শনিবার খাগড়াছড়িতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটল।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, গত ডিসেম্বর থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র সাড়ে আট মাসে রাঙামাটিতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক হত্যাকাÐের শিকার হয়েছেন ২৪ জন। হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে ১৫ জনকে। অপহৃত হয়েছেন ইউপিডিএফের দুই নারীনেত্রীসহ অন্তত ৪০ জন। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এসব সশস্ত্র সংঘাতের জেরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। নির্বিচারে একের পর এক খুন ও হত্যাচেষ্টার সঙ্গে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় আর চাঁদাবাজির কাজে অস্থির হয়ে উঠেছে পাহাড়ের পরিবেশ।

মাঝখানে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বছর তিনেক পার্বত্যাঞ্চলের কোথাও পাহাড়িদের মধ্যে অন্তর্দ্ব›েদ্ব কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। সে সময় পাহাড়ের তিন আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (সন্তু লারমা), ইউপিডিএফ ও জেএসএস সংস্কারের (এমএন লারমা) মধ্যে ‘অস্ত্র বিরতি’ চলছিল বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ নামে আরেকটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পর এই সমঝোতায় ছেদ পড়ে।

অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের মাত্র ১৮ দিনের মাথায় ৫ ডিসেম্বর নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ নেতা অনাদী রঞ্জন চাকমাকে (৫৫) খুন করলে পাহাড়ে নতুন করে খুনখারাবি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একই দিন অস্ত্রধারীদের গুলিতে খুন হন জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা অরবিন্দু চাকমা। এর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাসেল মারমা এবং রাঙামাটি শহরে জেলা মহিলা লীগের সহসভাপতি ঝর্ণা খীসাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় প্রতিপক্ষ।

১৫ ডিসেম্বর বন্দুকভাঙ্গায় গুলিতে খুন হন ইউপিডিএফের সংগঠক অনল বিকাশ চাকমা প্লুটো (৩৫)। ৩১ ডিসেম্বর নানিয়ারচরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পাহাড়ি দুই সশস্ত্র গ্রæপের বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন গৃহবধূ আসিয়া বেগম (৩৫)।

২ জানুয়ারি বিলাইছড়ির ফারুয়ায় যুবলীগ নেতা বিশ্ব রায় তঞ্চঙ্গাকে (৩০) গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। ৩০ জানুয়ারি বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন নেতা মৃণাল কান্তি তঞ্চঙ্গা (৫০), জয়নাল তঞ্চঙ্গা (৩৬) ও জয়চাঁদ তঞ্চঙ্গাকে (৬০) কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ১০ মার্চ বাঘাইছড়িতে ইউপিডিএফ নেতা নতুন মনি চাকমাকে (৪২) কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা।

১১ এপ্রিল নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ নেতা সুনীল তঞ্চঙ্গা (২৮) প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন। এর বদলা হিসেবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যা করা হয় জেএসএস সংস্কারপন্থি (এমএন লারমা) নেতা সাধন চাকমা পঞ্চায়ন (২৯) ও কালোময় চাকমাকে (৩০)। ২০ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৫ এপ্রিল রাঙামাটির দীঘিনালা মারিশ্যা সড়কে ইউপিডিএফ কর্মী তপন চাকমা (৪০) ও বিজয় চাকমা (৩২) এবং ১৬ এপ্রিল জেলা সদরের পেরাছড়ায় সূর্য বিকাশ চাকমাকে (৪৫) গুলি করে হত্যা করা হয়।

গত ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংস্কারবাদী জেএসএসের সহসভাপতি শক্তিমান চাকমাকে হত্যা এবং পরদিন ৪ মে তার শেষকৃত্যে অংশ নিতে যাওয়া গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ৫ জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা ও ৮ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

২৮ মে বাঘাইছড়ির সাজেকের গঙ্গারাম দক্ষিণ কড়ল্যাছড়ি এলাকায় প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের নেতা সঞ্জীব চাকমা (৩০), পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক নেতা অটল চাকমা (৩০) এবং ইউপিডিএফ সমর্থক স্মৃতি চাকমা (৫০)। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হন কানন চাকমা (৩৫) নামের আরেক নেতা।

১৫ জুন লংগদুর আটারকছড়া দজরপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক সদস্য রঞ্জন মনি চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের অস্ত্রধারীরা। ১৭ জুন বাঘাইছড়ির রূপকারী ইউনিয়নের দেখাইয়াপাড়া এলাকায় সন্ত্রাসীরা জেএসএস সংস্কারবাদী দলের নেতা সুরেন বিকাশ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। ২৬ জুলাই বাঘাইছড়িতে সশস্ত্র তিন আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের মধ্যে ২ ঘণ্টাব্যাপী চলা বন্দুকযুদ্ধে বন কুসুম চাকমা (৩০) নামে এক যুবক নিহত হন।

গত সাড়ে আট মাসে রাঙামাটিতে প্রতিপক্ষের হাতে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে অপহরণ করা হয়েছে নানিয়াচর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউপিডিএফ নেতা প্রীতিময় চাকমাসহ (৬৬) ২৭ গ্রামবাসীকে। এর আগে গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুকছড়ি আবাসিক স্কুল এলাকা থেকে অপহৃত হন ইউপিডিএফের নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের দুই নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে মাসখানেক পর তারা মুক্তি পান।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ), গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অন্তত ২৬ জনকে খুন করা হয়।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে