বিদেশে পালিয়েই গেল সুন্দরী সোহেল

  ইউসুফ সোহেল

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৪৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মহাখালীতে যুবলীগ নেতা কাজী রাশেদ হত্যাকা-ের দেড় মাস পার হলেও বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ সরদার সোহেল ওরফে সুন্দরী সোহেলসহ মূল অভিযুক্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। খুনিরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য সুন্দরী সোহেলসহ আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল পুলিশ প্রশাসন।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ডিঙিয়ে সোহেল এখন সদলবলে ভিনদেশে বসবাস করছেন। সেখানে বসেই তিনি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বনানীর অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে দাবি নিহতের স্বজন এবং সোহেলের পরিচিতজনদের। গতকাল শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টার দিকেও সোহেল +৬৮১২৭৩৯৯৫১২৮ নম্বর থেকে তার এক পরিচিতজনের কাছে ফোন করে এলাকার খোঁজখবর নিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

গত ১৫ জুলাই ভোরে সুন্দরী সোহেলের অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘রেইনবো টোয়েন্টিফোর নিউজ ডটকম’ অফিসের পেছনের গলি থেকে রাশেদের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের আগের রাতে হাতে পলিথিন জড়িয়ে সুন্দরী সোহেলের ‘দেহরক্ষী’ সন্ত্রাসী হাসু ও খিলক্ষেতের ত্রাস জহিরুল, মিডিয়া নিয়ন্ত্রক দিপন ওরফে দিপু এবং মহাখালী দক্ষিণপাড়ার ডিশ ব্যবসায়ী ফিরোজ নিহত রাশেদের লাশ ধরাধরি করে রেইনবো কার্যালয় (মহাখালীর বন ভবনের অদূরে কঙ্কাল বাড়ি) থেকে বের করে নিয়ে যায়। যা ভবনটির সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।

গত সপ্তাহে খিলক্ষেতের বরুয়া রাজাপুর এলাকায় রাশেদ হত্যাকা-ে জড়িত জহিরুলের বাসা সিলগালা করে দেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। জহিরুলের বাবার নাম কটু ওরফে জাউরা কটু। হত্যাকা-ের চার দিন পর ১৯ জুলাই সোহেলের অফিসে তল্লাশি চালিয়ে চারটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১২২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। এ বিষয়ে আরও একটি মামলা হয় সোহেলদের বিরুদ্ধে। ওই অভিযানে সেই ফ্ল্যাট থেকে ৩ নারীকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। তবে তাদের কাউকেই আদালতে তোলা হয়নি বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে।

রাশেদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর বনানী থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জাকির হোসেন সরদার ওরফে ‘ভাতিজা জাকির’ (সোহেলের চাচা) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, রাশেদ খুনে সুন্দরী সোহেল সরাসরি জড়িত। ঘটনার দিন ১৪ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে সোহেল মোবাইল ফোনে জাকিরকে রেইনবো কার্যালয়ে আসতে বলেন। জাকির কঙ্কাল বাড়িতে আসার পর দেখতে পান সোহেল, ফিরোজ, দীপু, হাসু, জহিরুল, কাজী রাশেদসহ (নিহত) আরও দু-তিনজন দাঁড়িয়ে আছেন।

সোহেল ও ফিরোজ একটু দূরে ডেকে নিয়ে জাকিরকে বলেন, ‘আজ রাশেদকে ফালাইয়া দিমু, তুই নিচে পাহারায় থাকিস। কেউ যেন ওপরে যেতে না পারে।’ রাশেদকে নিয়ে সোহেল, ফিরোজ, হাসু, দীপু ও আরও দু-তিনজন তৃতীয় তলায় সোহেলের অফিসে যায়। কয়েক মিনিট পর একাধিক গুলির শব্দ শুনতে পান জাকির। এর কিছুক্ষণ পর সোহেল ও অপরিচিত একজন নিচে নেমে এসে জাকিরের হাতে একটি ছোট বাক্স ধরিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলে দ্রুত কঙ্কাল বাড়ি ছাড়েন।

এর কিছু সময় পর হাসু, দিপু, জহিরুল ও ফিরোজ রাশেদের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে এনে গেটের বাইরে দেয়ালের পাশে ফেলে দেয়। এ সময় তাদের হাতে পলিথিন জড়ানো ছিল। গত ৮ আগস্ট ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে এই জবানবন্দি দেন জাকির। এর আগের দিন তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের সংশ্লিষ্টরা।

নিহত রাশেদের ভাই রাজীব গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, হত্যাকাণ্ডের ৫৪ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ রাশেদের খুনি একজনকেও ধরতে পারল না। শুনেছি, সুন্দরী সোহেল সদলবলে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে গেছেন। সেখান থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ রাখছেন এখানকার লোকজনের সঙ্গে। মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য হুমকি দিচ্ছে তার ক্যাডাররা।

গত শুক্রবার রাশেদ ভাইয়ের চেহলামের দিনও সোহেলের বড় ভাই মাসুদ এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী রাজু, রুবেল, রবিন ও ফয়সাল এসে হুমকি দিয়ে বলেছে, রাশেদের পরিণতি দেখতে না চাইলে যেন এই মামলা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। তাদের হুমকি-ধমকিতে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে রাশেদের খুনিদের গ্রেপ্তার করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান রাজীব।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের পরিদর্শক মনিরুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, কাজী রাশেদ হত্যাকা-ে জড়িত জাকির হোসেন ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। জাকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন শোনা যাচ্ছে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যদিও লিগ্যাল ডকুমেন্টস না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে