আমাদের সময়কে ড. কামাল হোসেন

সবাই সরকারকে অনির্বাচিত বলে

  মামুন স্ট্যালিন

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত হিসেবে আখ্যা দিয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের অনির্বাচিত বললে আমার ওপর ভীষণ চটে যান। অথচ আমি একাই তাদের অনির্বাচিত বলি না। দেশে-বিদেশে সবাই এ সরকারকে অনির্বাচিত বলে। কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ছিল; দেশের জনগণের মতামতের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আমাদের সময়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের এই সংবিধানপ্রণেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আগামীতে দেশের রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হবে। মানুষের ভাবনার মধ্যে ঐক্য হয়ে আছে। জনগণ জেগে উঠেছে, তাদের ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবে না। শিগগিরই দেখবেন দেশে পরিবর্তনের পালা শুরু হয়ে যাবে।

বর্তমান সরকারকে দৃশ্যত যারা সমর্থন করেন তারাও আজ উদ্বিগ্ন বলে মন্তব্য করেন ড. কামাল। কতিপয় দুর্নীতিবাজ ও মিথ্যাবাদী কতদিন দেশের ১৬ কোটি জনগণকে আটকিয়ে রাখবে? এমন প্রশ্ন রেখে তিনি নিজেই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ডাকে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশে জামায়াত, ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক শক্তি ছাড়া সবাইকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল বলেন, কোনো একক ব্যক্তির আবেদনে ঐক্য হয় না। সকলের ঐক্যের মধ্য দিয়ে জাগরণ সৃষ্টি হয়। যেমন হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। যারা কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন, কার্যকর গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা চায় তাদের উদাত্ত আহ্বান জানাই ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের লক্ষ্যেই এ সমাবেশ।

সমাবেশের অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যদি সংবিধান মানে তবে অবশ্যই সমাবেশের অনুমতি দেবে। তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলবে অথচ কেউ সমালোচনা করলে তা সহ্য করবে নাÑএটা কোনো গণতন্ত্রই নয়। গণতন্ত্রে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাও দিতে হয়।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার এই আহ্বায়ক ১/১১-এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা প্রায়ই আমাকে ১/১১ সৃষ্টির কুশীলব বলে থাকেন। অথচ ১/১১ এর কারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। যেদিন ১/১১-এর প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়, সেদিন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে আমাকে ফোন করে বলা হয়েছিল, চলেন বঙ্গভবনের শপথ অনুষ্ঠানে যাই। ৫০ বছরের বেশি সময় হলো রাজনীতি করি। আমি কখনো কোনো ষড়যন্ত্র করিনি; ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমি ছিলাম না। যা বলি ও করি, তা প্রকাশ্যেই।

কিছুদিন আগে বদিউল আলম মজুমদারের বাসার সম্মিলন প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সৌজন্যে সেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। এটি ছিল নিতান্ত ঘরোয়া অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠান নিয়ে এবং আমাকে ঘিরে সরকারদলীয় নেতারা যে সব বক্তব্য দেন, সেগুলো ডাহা মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আরও দুঃখজনক হলো, ওই অনুষ্ঠান শেষে যাওয়ার সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার ঘটনাটি। এর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষুণœ হয়েছে।

বিশিষ্ট এই আইনজীবী বলেন, দেশের বর্তমান অসুস্থ রাজনীতি থেকে পরিত্রাণ পেতে রাজনৈতিক ঐক্য চাচ্ছি, সকলের ঐক্য চাচ্ছি। দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করার জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

ড. কামাল বলেন, বর্তমান সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই। শিক্ষার্থীরা চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটার সংস্কারে আন্দোলন করেছে; নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য রাজপথে নেমেছে। আমি বুঝতে পারি না, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের আন্দোলন দমনে সরকার কেন সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করেছে!

গণফোরাম সভাপতি বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সন্ত্রাস, গুম-খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতি বেড়েছে। তাই উন্নয়নের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্যই অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠাসমূহের হাজার-হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে।

প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বলেন, শুধু নির্বাচনকালেই নয়, সব সময়ই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। পক্ষপাতহীন জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছ নিয়োগ ও মৌলিক সংস্কার করতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানকে সমুন্নত রেখেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে; অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার প্রসঙ্গে ড. কামাল বলেন, জেলখানায় আদালত স্থাপন ঠিক না। এক্ষেত্রে কর্নেল তাহেরের উদাহরণ টানা হচ্ছে। সেটা ছিল সামরিক শাসনের সময়কালের বিচার। ৪১ বছর আগের এমন একটি উদাহরণ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষে যাবে না।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে