নদীতে বিলীন নড়িয়ার সোনাঝরা অতীত

  সানাউল হক সানী ও রোমান আকন্দ নড়িয়া থেকে

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০১ | প্রিন্ট সংস্করণ

ওই যে দূরে জল পাক খাচ্ছে, সেখানেই ছিল আমার বাড়ি। গাছপালা, গোয়ালঘর ছিল; ছিল ফসলি জমিও। এখন আর কিছুই নেই। বিষণ্ন মুখে কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ষাটোর্ধ্ব সূর্যবানু। এক সপ্তাহ আগে বাড়িঘর হারানো এই বৃদ্ধার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে নদীর পারে দাঁড়িয়ে পাক খাওয়া সেই জলরাশির দিকে চেয়ে থেকে। পদ্মার জলে সোনাঝরা অতীত দেখেন, অপলকে চেয়ে থেকে ভাবেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা।

বসতভিটা এ পর্যন্ত চারবার ভাঙতে দেখেছেন সত্তরোর্ধ্ব আম্বিয়া খাতুন। সবশেষ আবাস গেড়েছিলেন নড়িয়ার চরজুজিরা গ্রামে। এখন পুরো গ্রামটিই বিলীন হয়ে গেছে পদ্মায়। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে রাস্তার পাশে প্লাস্টিক দিয়ে তাঁবু বানিয়ে দিন পার করছেন তিনি। এখন পর্যন্ত পাননি কোনো ত্রাণ। কোনো দিন একবেলা আবার কখনো খাবারই জোটে না মা ও মেয়ের।

পদ্মার ভাঙনের এমন দৃশ্য নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে প্রমত্তা পদ্মার করালগ্রাসে বিলীন হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। যদিও সম্প্রতি ভাঙন রোধে একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রায় তিন মাস ধরে নতুন করে নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা যায়। কিন্তু আগের মতোই কর্তৃপক্ষ শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। এক মাস ধরে ব্যাপক আকার ধারণ করে ভাঙন। চরজুজিরা, বাঁশতলা, সাধুরবাজার, ওয়াপদা এলাকা বিলীন হয়ে গেছে পুরোটাই। পৌরসভার ২ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ এলাকাও বিলীন। সুরেশ্বর, কেদারপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকাও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে গত কয়েক দিনে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে ২০০ বছরের প্রাচীন মূলফতগঞ্জ বাজারের পাঁচশর মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যে কোনো সময় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসে নদীভাঙনের শিকার হয়ে পাঁচ হাজার ৮১টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চারটি বাজার, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিন বেসরকারি ক্লিনিক, সাত মসজিদ, একটি মন্দির, ৯টি সেতু ও ১৬টি বহুতল ভবনসহ প্রায় ৮০ পাকাবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

কেদারপুর ইউনিয়নে স্বনামধন্য দেওয়ান পরিবার। অঢেল সম্পদের মালিক এ পরিবারের প্রায় সবাই নদীভাঙনের শিকার। ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে ফসলি জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিছুই আর অক্ষত নেই। দেওয়ান বংশের জুয়েল হোসেন দেওয়ান অপলক তাকিয়ে ছিলেন নদীর দিকে। তিলে তিলে গড়া সব কিছুই যে ওই নদীতে বিলীন। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার মতো আর কোনো অবলম্বন নেই। আমাদের ক্লিনিক, মার্কেট ও বাড়িঘর সব কিছুই পদ্মার গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১৫০ বিঘা ফসলি জমিও গত কয়েক দিনে ভেঙে গেছে। সব মিলিয়ে শতকোটি টাকারও বেশি সম্পদের মালিক থাকলেও বর্তমানে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

প্রতিবন্ধী দুই ছেলে নিয়ে সংসার ছিল নাজমুল হাসান মিজানের। অভাব থাকলেও সুখেই ছিলেন। পদ্মার গ্রাসে আজ সবই অতীত। থাকার জায়গা নেই, পরিবারের ছয় সদস্যের মুখে দিনে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়াই তার কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নড়িয়ার ভাঙনকবলিত এলাকায় সর্বত্র কেবল বিষাদের সুর। ধনী-গরিব সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সর্বনাশা পদ্মা। সব হারা মানুষের আকুতি হৃদয় ছুঁয়ে যাবে যে কারো। অনিশ্চিত জীবনে সবাই ব্যস্ত এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে। যাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, তারা ছুটছেন নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। নদীর আশপাশে যাদের বাড়ি এখনো অক্ষত, নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। অনেকে পরম মমতায় গড়া বাড়িটি ভাঙছেন। বড় বড় ভবন বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে ৩০-৪০ হাজার টাকায়। সবার মধ্যেই চাপা আতঙ্ক-উদ্বেগ। ভাঙন আরও কিছু দিন অব্যাহত থাকলে হয়তো নড়িয়া সদরই বিলীন হয়ে যাবে। মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে শরীয়তপুর জেলার।

সাধারণ মানুষের আকুতি ভাঙন ঠেকাতে যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ষাটোর্ধ্ব কালাম মল্লিকের চোখেমুখে ক্রোধের ছাপ। তিনি বলেন, দুই-এক দিন পাঁচ-দশ কেজি চাল দিয়ে ছবি তুলেই নেতারা এলাকা ছাড়া। কিন্তু বছরের পর বছর এমন ভাঙন চলে আসছে। কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। আমরা ত্রাণ চাই না, চাল-ডাল চাই না। ভাঙন রোধে বাঁধ চাই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূর্ব নড়িয়া গ্রামের সুফিয়া খাতুন বলেন, ২০ শতাংশ জায়গার ওপর বড় বাড়ি ছিল। মূলফতগঞ্জ বাজারে দোকান ছিল স্বামী সোহেল মিয়ার। সবই কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা পদ্মা। দুই মাসের ব্যবধানে আজ আমরা ঠিকানাহীন হয়ে পড়েছি। একই রকম কথা আকরামউদ্দিন, শফিকুল ইসলামসহ পদ্মায় সব হারানো অনেক মানুষের।

ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম জোবেদ আলী দেওয়ান। একা একা বসে কাঁদছিলেন পদ্মার পারে বসে। তিনি বলেন, কৃষিই ছিল একমাত্র জীবিকা। সব কেড়ে নিয়েছে ওই পদ্মা। পরিবারের সদস্যরা পথ চেয়ে বসে থাকেন কখন খাবার নিয়ে যাব। কিন্তু কাজ নেই, টাকা নেই, থাকার জায়গা নেইÑ এমন অসহায় মুহূর্তে বুঝতে পারছি না কী করব। সব কিছু কেড়ে নেওয়া পদ্মার তীরে বসে তাই তাকেই প্রশ্ন করি। বেশ কিছু দিন ধরে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করলেও মাত্র একদিন ত্রাণ হিসেবে পাঁচ কেজি চাল পেয়েছিলেন তিনি। এর পর আর কিছুই মেলেনি।

আংশিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাহিতুন কাঁদতে কাঁদতে এখন আর চোখেই দেখেন না। দুবার ভাঙনের শিকার হলেও শেষ জীবনে এমন দুর্বিষহ অবস্থা থেকে ফেরার কোনো পথ দেখছেন না। নদীর দিকে ইশারা করে বলেন, ওই দূরে স্রোতের দিকটাতেই আমার ঘর ছিল। প্রায় ৫০ বছর একসঙ্গে সংসার করা স্বামীর কবরও ছিল সেখানে। কিন্তু এখন কিছুই নেই। স্বামী পরিত্যক্ত দুই মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই তার।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের আমাদের সময়কে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছি। নদীতে ২৫০ কেজি বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার পিস বস্তা ফেলা হয়েছে। তবে পানির প্রবাহ না কমলে বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। পানি কমলে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে