নির্বাচনী কূটনীতি

পূর্বমুখী আওয়ামী লীগ # পশ্চিমমুখী বিএনপি

  আলী আসিফ শাওন

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কূটনৈতিক যোগাযোগ। দেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত এ দুটি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ পূর্বমুখী এবং বিএনপিতে পশ্চিমমুখী তৎপরতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

পার্শবর্তী দেশ ভারত ও এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীনের সঙ্গে সমানতালে সম্পর্কোন্নয়নে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র, য্ক্তুরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপির শীর্ষনেতারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সব সময়ই বাংলাদেশে এ ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।

কূটনৈতিক অঙ্গনে যোগাযোগ রাখেন আওয়ামী লীগের এমন কয়েক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ সামগ্রিক বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন দলটির নেতারা। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের তিন পাশে ভারতের অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় ভারতকে।

গত মঙ্গলবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি তার বক্তব্যে ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে ভারত সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা’ প্রত্যাশা করেন। জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা পরিবারের মতো নিবিড়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে একাধিকবার শেখ হাসিনা-মোদির ভিডিও কনফারেন্স হওয়ার কথা। এ সময়কালে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে চলা বেশকিছু প্রকল্প উদ্বোধনের কথা রয়েছে দুই প্রধানমন্ত্রীর। এ ছাড়া বাংলাদেশের নির্বাচনের আগেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ঢাকায় সফরে আসতে পারেন। অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও সমানতালে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে আওয়ামী লীগ। যদিও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও চীনের মধ্যে শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছে।

ভারতের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় কিছুটা কৌশলী টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনে আশাবাদী আওয়ামী লীগ। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, মাসখানেক আগেই চীনা সরকার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ১৯ নেতাকে দেশটিতে সফরের নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রটির নিমন্ত্রণ যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার চীনের কমিউনিস্ট সরকারের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলটির সঙ্গে যোগাযোগও করেছে এ সফর চূড়ান্তকরণের বিষয়ে। এ সফরের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হলেও কৌশলী আওয়ামী লীগ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবে। তাই দলের পক্ষ থেকে এখনো চীন সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়নি।

এ ছাড়া আগামীকাল শুক্রবার জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে বিশ্বের নানা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমদ আমাদের সময়কে বলেন, পূর্ব বা পশ্চিম নয়, সকলের সঙ্গেই সম্পর্কোন্নয়নে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ। শুধু ভারত, চীন নয় আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’ মেনে চলে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর এখনই নজর দিতে জাতিসংঘের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বিএনপি। এ জন্য সংস্থাটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ‘উদ্যোগের’ কথা স্মরণ করিয়ে দলের নেতারা বলেছেন, এ উদ্যোগের সফল সমাপ্তি হওয়া উচিত।

সম্প্রতি জাতিসংঘ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের শীর্ষপর্যায়ের নজরে আনার কাজ শুরু করেছে বিএনপি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের রাজনৈতিকবিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। সফরকালে সেখানকার থিঙ্কট্যাঙ্কদের সঙ্গেও বৈঠক করে বিএনপি।

এরই ধারাবাহিকতায় এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সদর দপ্তর ব্রাসেলস ও যুক্তরাজ্য যাবে দলটির একটি প্রতিনিধি দল। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় পশ্চিমা রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থাগুলোকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানাতে এ সফরগুলো হচ্ছে।

দলটির আন্তর্জাতিক উইংয়ের নেতারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দলের একটি প্রতিনিধি দলের ভারত সফরের কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবু নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এ সফর হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। জানা গেছে, আগামী মাসে ব্রাসেলস ও যুক্তরাজ্য সফর ছাড়াও জাতিসংঘ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফলোআপ বৈঠতে যাবেন বিএনপি নেতারা। নির্বাচনের আগে পর্যন্ত এভাবে দলের আন্তর্জাতিক উইংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈঠক করে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সমকে বলেন, পূর্ব-পশ্চিম নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়- এ মূলনীতিকে অনুসরণ করে জাতীয় মর্যাদা এবং স্বার্থ সংরক্ষণ করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৎ পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর এ কূটনৈতিক তৎপরতাকে ভালো চোখে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিভিন্ন সময় নির্বাচনী কূটনীতির নামে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এটা নতুন কিছু নয়। মূলত এর মধ্য দিয়ে জনগণের প্রতি অনাস্থা দেখান আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা। তাদের বুঝতে হবে বাইরের কোনো দেশ নিজের স্বার্থ ছাড়া আমার দেশের সমস্যার সমাধান করে দেবে না। তাই নিজেদের সমস্যা সমাধানের আন্তর্জাতিক মোড়লদের কাছে দ্বারস্থ হওয়ার অর্থ নিজের দেশকে ছোট করা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে