দেশত্যাগে আমাকে বাধ্য করা হয় : নতুন বইয়ে এসকে সিনহা

  আমাদের সময় ডেস্ক

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

আত্মজীবনীমূলক বই লিখেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেওয়ার পর তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। দেশ ছাড়ার পর বাধ্য হয়েই তিনি পদত্যাগ করেন এবং বিদেশেই বসবাস করছেন।

‘এ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ নামে বইটি ই-কমার্স সাইট অ্যামাজনে গত রোববার থেকে পাওয়া যাচ্ছে। বইটির সূত্র ধরে গতকাল বুধবার বিচারপতি এসকে সিনহার সাক্ষাৎকার নেয় বিবিসি বাংলা।  এখানে সাক্ষাৎকারটির অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো।

কেন গত বছর দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে এসকে সিনহা বলেন, 'আমাকে কমপ্লিটলি হাউস অ্যারেস্ট করা হলো। তখন আমি মনে করলাম যে স্বাধীনতা; আরেকটা বিষয় হলো, পিজি হাসপাতাল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে প্রতিদিন একজন ডাক্তার পাঠানো হতো। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। এর মধ্যে একদিন রাতে একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে আমাকে চার্জ করলেন। আপনাকে বলা হলো আপনি বিদেশ যাবেন, যাচ্ছেন না কেন। আমি বললাম, কেন আমি বিদেশ যাব।'

তিনি বললেন, 'আপনি চলে যান আপনার টাকা-পয়সার আমরা ব্যবস্থা করছি। আমি বললাম, এটা হয় না। আমি আপনাদের টাকা নেব না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করি, ব্যাপারটি কী হয়েছে আমি জানতে চাই। তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী তো আপনার সঙ্গে কথা বলবেন না।'

বিচারপতি সিনহা দাবি করছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি যেন সরকারের পক্ষে যায়, সে জন্য তার ওপর সরকারের একটি মহল থেকে চাপ তৈরি করা হয়েছিল।

উচ্চ আদালতের পাঁচ বিচারকের তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রসঙ্গে এসকে সিনহা বলেন, 'আমাদের বিচারক, আমার চারজন বিচারক এসে বললেন তারা আমার সঙ্গে বসবেন না। কারণ রাষ্ট্রপতি নাকি তাদের ডেকে বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। আমার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সেদিনও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা হয়েছে দুপুরে। তার সঙ্গে হাসিঠাট্টা করলাম। তার কাছে যদি এরকম কোনো অভিযোগ থাকে, তিনি তো তখনই আমাকে বলতে পারতেন। তিনি আমাকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ না বলে আমার অধীনস্থ বিচারকদের বলেন আমার সঙ্গে না বসতে।'

বইটিতে সিলেটের আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবনের শুরু থেকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত এসকে সিনহার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উঠে এসেছে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেওয়ার পর সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা বিরূপ মন্তব্য করতে শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে বদনাম করা শুরু হয়। কয়েক মন্ত্রী বলতে শুরু করেন তিনি (সিনহা) অসুস্থ এবং চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছেন।

ওই বছরের ১৪ অক্টোবর বিদেশে যাওয়ার সময় তিনি আশা করেছিলেন, বিদেশ থাকাকালে উচ্চ আদালতে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় এবং তার অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সরকারও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্বের বিষয়টি বুঝতে পারবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থার ভীতি প্রদর্শনের কারণে বিদেশে থেকেই তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

বইটিতে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বিচার বিভাগের চ্যালেঞ্জ, বিচার বিভাগ ও রাজনীতিবিদদের মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পুলিশের বাড়াবাড়ি, জরুরি অবস্থার প্রভাব এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অর্থ আদায়ের বিবরণও রয়েছে।
২০১৭ সালের ১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দেন আপিল বিভাগ। ওই সংশোধনীতে উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সরকার সমর্থক আইনজীবীরা বিচারপতি এসকে সিনহার তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি তার পদত্যাগ দাবি করেন। এর মধ্যেই ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর হঠাৎ তার এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা আসে। ৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (এসকে সিনহা) অসুস্থ, ক্যানসারে আক্রান্ত।’ ১৪ অক্টোবর রাতে বিচারপতি সিনহা অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন।

ওইদিন রাতে বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। আমি চলে যাচ্ছি। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আবার ফিরে আসব।’ লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি, কিন্তু ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী, বিশেষ করে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়ে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের একটি মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশন করায় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন, যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শঙ্কিতও বটে।’

এরই মধ্যে আপিল বিভাগের বাকি পাঁচজন বিচারপতির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বৈঠকে বসেন। সেখানে বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বলে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন। এসকে সিনহা দেশ ছাড়ার পরদিন সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ব্যাপারে বিচারপতি এসকে সিনহার কাছ থেকে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না পাওয়ায় বাকি বিচারপতিরা তার সঙ্গে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করতে অসম্মতি জানান। ১০ নভেম্বর এসকে সিনহা সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। এর আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে