এক বছর পেছাচ্ছে পদ্মা সেতু

  তাওহীদুল ইসলাম

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:১২ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার প্রতিশ্রুত সময়ে শেষ হচ্ছে না বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সেতুটির কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় চাওয়া হয়েছে সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে। ফলে সরকারের বর্তমান মেয়াদে যে পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে না, তা অনেকটাই নিশ্চিত। সেতুটির প্রকল্প কর্মকর্তাও প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি ছিল অন্যতম। কথা ছিল, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই এর নির্মাণকাজ শেষ হবে। সে হিসাবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পদ্মা সেতু চালুর কথা।

সড়ক সেতুর সঙ্গে রেলপথ যুক্ত হওয়ার পরও বলা হয়েছিল, নির্ধারিত সময়ে সেতুটি চালু হবে এবং সড়কের পাশাপাশি রেলপথও চালু হবে। কিন্তু ট্রেন চলাচলে রেলপথ সংযোগ প্রকল্পের মূল কাজ এখনো শুরু হয়নি। আগামী ১৩ অক্টোবর পদ্মা সেতুতে রেলের সংযোগ কাজের উদ্বোধন এবং সেতুটির নির্মাণ কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের আগেই এ সেতুর নাম ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’ করতে প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি হয় বিশ্বব্যাংকের। একই বছরের সেপ্টেম্বরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কার্যত দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এর পর সরকার সিদ্ধান্ত নেয় নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের। যদিও পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।

অন্যতম আলোচিত ও ব্যয়বহুল পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ দ্রুত সমাপ্ত করতে এ প্রকল্পকে ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত বা অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্র্ভুক্ত করা হয়। সঙ্গত কারণেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ প্রকল্প কাজের নিয়মিত তদারকি করা হয়। প্রকল্পটির সর্বশেষ সংশোধিত অনুমোদন অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সম্প্রতি সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্মাণকাজের মেয়াদ বৃদ্ধির।

এ সংক্রান্ত ৭ পৃষ্ঠার প্রস্তাবটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাঠানো হয় সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনে। বিলম্বের কারণ হিসেবে ৪টি যুক্তি দেখানো হয়েছে প্রস্তাবে এক. নদীর তলদেশের গভীরে নরম মাটির স্তর থাকায় সেতুর পিলার (পিয়ার) স্থাপনে সমস্যা; দুই. ২২টি পিয়ারের নতুন নকশা; তিন. নদীশাসন কাজে বিলম্ব এবং চার. নদীভাঙন ও প্রবল স্রোত।

প্রস্তাবের বিষয়ে সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সেতুর কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। প্রস্তাবে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্য পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সময় বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ইতোমধ্যে। কী কারণে বাড়াতে হচ্ছে, তা সেখানেই বলা আছে।

প্রকল্পের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, এ পর্যন্ত সেতুটি নির্মাণে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৮ শতাংশ। ইতোমধ্যে ৫টি স্প্যান বসানো হয়েছে। এতে করে ৭৫০ মিটার পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়েছে সেতুটি। পিলারের ওপর ইস্পাতের স্প্যান বসানো হচ্ছে। এ স্প্যানের ভেতর দিয়েই হবে রেলপথ। আর ওপর দিয়ে চলবে সড়কযান।

নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় এর আগে মাওয়া প্রান্তে ভাঙন দেখা দেয় এবং জাজিরা প্রান্তে সৃষ্টি হয় চর। ফলে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণে বাড়তি ১৪শ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। তখন বলা হয়, জমি অধিগ্রহণে দেরি হলে পুরো প্রকল্পই পিছিয়ে পড়বে। চলতি বছরের ২১ জুন একনেক বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়। ফলে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল এ সেতুটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রথমে সময় ধরা হয় ২০১৫ সালের ৩০ জুন। পরে তা বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এখন আরও এক বছর সময় চাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে সেতু বিভাগ বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পদ্মা সেতুর নকশা করেছিল মনসেল এইকম নিউজিল্যান্ড। এডিবির আর্থিক সহায়তায় তখন প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা করা হয়। তৎকালে এ সেতুতে আর্থিক সহায়তা প্রদানে চুক্তিবদ্ধ দাতা সংস্থার অভিযোগÑ তদন্ত ও মামলাসহ নানাবিধ কারণে প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে পড়ে। দেরিতে কাজ শুরু করায় ততদিনে নদীর গতিপথেও পরিবর্তন আসে।

সেতুটি নির্মাণের জন্য নদীশাসন কাজের চুক্তিতে ৬ কোটি ঘনমিটার বা ২১২ কোটি ঘনফুট ড্রেজিংয়ের কথা উল্লেখ আছে। জাজিরা প্রান্তে মূল সেতুর উজান ও ভাটির ডুবোচর এলাকায় কিছু স্থান ধরা ছিল। সেখানে চাষাবাদ বা জনবসতি ছিল না। কিন্তু নদীর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে চিহ্নিত স্থানগুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে জমি অধিগ্রহণ করতে হয় এবং অতিরিক্ত ব্যয় ধরতে হয় ১৪শ কোটি টাকা। এ ছাড়া সেতুর নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণকালে ভূতত্ত্বগত তদন্তে মাটির স্তরে তারতম্য দেখা যায়।

এ কারণে মূল নদীর ৪০টি পিয়ারের মধ্যে ১৪টি পিয়ারের পাইলের নকশা নতুন করে করতে হয়। একই কারণে চলমান আরও ৮টি পিয়ারের পাইল ড্রাইভের কাজও স্থগিত করে সেতু কর্তৃপক্ষ। ফলে মোট ২২টি পিয়ারের পাইলে নতুন করে নকশা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫টি পিয়ারের পাইলে নতুন করে নকশা করে ঠিকাদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৭টির নতুন নকশা করার কাজ এখনো চলছে। ঠিকাদারকে যথাসময়ে নকশা বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় শিডিউল নির্ধারিত সময়ানুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।

এ ছাড়া সেতুর মূল অংশের ৭টি মডিউলে (নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পরিমাপের একক) ৪১টি ইস্পাতের ট্রাসের (সেতু ধরে রাখার কাঠামো) স্প্যান রয়েছে। একেকটি ট্রাসের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। সেতুর কিছু অংশে সোজা এবং কিছু অংশে হরাইজনটাল ও ভার্টিক্যাল বাঁক থাকায় ট্রাসগুলো বানাতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসক্রম লাগে। আগের নকশা অনুযায়ী ট্রাস তৈরি করায় এ নিয়েও সমস্যা হচ্ছে। নতুন করে ২২টি পিয়ারের পাইলের নকশা করতে হচ্ছে। অথচ চীন থেকে আগের করা নকশা অনুযায়ী নির্মাণস্থলে সরবরাহ করা হয় ট্রাসগুলো।

সেতুর কাজ পিছিয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ আছে। জাজিরা প্রান্তে নদীশাসনের ১১০০ মিটার ট্রায়াল সেকশনের কাজ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান; দেড় বছর দেরি হয়। ফলে মূল কাজেও এর প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের বর্ষা মৌসুমে মাওয়া প্রান্তে ৩ দশমিক ৫ মিটার থেকে ৪ মিটার/সেকেন্ড গতিতে নদীর পানি প্রবাহিত হয়। এমন প্রবল স্র্রোতের কারণে প্রায় ৫ দশমিক ৫ লাখ ঘনমিটারের ২টি ‘ক্ষয়-গর্ত’ সৃষ্টি হয়। ফলে সে সময় ট্রায়ালের কাজ স্থগিত রেখে জরুরি ভিত্তিতে গর্ত দুটি ভরাট করা হয়। তখন জিওব্যাগের মাধ্যমে গর্ত ভরাট করে ওই স্থানের প্রবল ভাঙন রোধ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এ কাজে অতিরিক্ত ৬ মাস সময় ব্যয় হয়। এতেও নির্মাণকাজ বিলম্ব হয় বলে সেতু কর্তৃপক্ষের দাবি।

সূত্রমতে, ২০০৭ সালের ১ জুলাই ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। পুরো সেতুতে মোট পিলার থাকবে ৪২টি, এর মধ্যে নদীতে ৪০টি। এক পিলার থেকে আরেক পিলারের দূরত্ব ১৫০ মিটার। ৪২টি পিলারের ওপর এ রকম ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। এ প্রকল্পে এ পর্যন্ত মেয়াদ ও ব্যয় বেড়েছে তিন দফায়। সর্বশেষ প্রস্তাবে আরও এক বছরের জন্য নির্মাণকাজের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে