তিতাসের এমডির চেয়ারে বসতে লড়াই চারজনের

সিবিএসহ চার গ্রুপ তৎপর # অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ

  লুৎফর রহমান কাকন

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (তিতাস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পছন্দের কর্মকর্তাকে বসাতে তৎপর হয়ে উঠেছে চারটি গ্রুপ। এমনকি তিতাসের কর্মচারীদের সংগঠন সিবিএ পর্যন্ত দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি গ্রুপেরই দৌড়ঝাঁপ চলছে এমপি-মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী মহলে। এ নিয়ে চলছে বহুমুখী স্নায়ুযুদ্ধ।

এর মধ্যে এমডি পদপ্রত্যাশীরাও পরস্পরের বিরুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন বাগযুদ্ধে; চলছে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের বান। এতে করে তিতাসের ভাবমূর্তি ভীষণ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। কে হবেন তিতাসের পরবর্তী এমডি? এমন প্রশ্নে পাঁচ কর্মকর্তার নাম নিয়ে চলছে গুঞ্জন। তাদের মধ্যে একজন অবশ্য জানিয়েছেন, তিতাসে চাকরি করাটা একটা শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি আগ্রহী নন।

দেশের একটি বড় অংশে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত শিল্প এলাকাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ করে থাকে তিতাস। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহের ভালুকাসহ রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোয় যত শিল্প-কারখানা আছে, সেগুলোয় গ্যাস সংযোগ-সরবরাহ-লোড বৃদ্ধিসহ বিবিধ প্রয়োজনে গ্রাহককে তিতাসের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সীমিত।

চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সংকট থাকায় শিল্প-কারখানায় গ্যাস-সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি আপাতত বন্ধ আছে। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের করা উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে গ্যাসের সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। এ সংকটকে পুঁজি করে তিতাসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রাহকদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন এ অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। দুর্নীতির দায়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দ-িত এমনকি চাকরিচ্যুতও হয়েছেন।

তাই তিতাসের এমডি পদে পছন্দের লোককে বসাতে পারলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে এমন ভাবনা থেকেই কোম্পানিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একাধিক সিন্ডিকেট পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। জোর গুঞ্জন রয়েছে, দেশের বড় কিছু শিল্প গ্রুপের কর্ণধারও এসব সিন্ডিকেটকে নেপথ্য থেকে মদদ দেন। এর পর সময়মতো আর্থিক ফায়দা লুটেন; তাদের শিল্প-কারখানায় কোটি কোটি টাকার গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করেন। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, খোদ তিতাসের বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও কারও বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন তদবির ও ফাইল বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার।

তিতাসের বর্তমান এমডি ও দুই ডিএমডি এবং অন্য দুটি কোম্পানির এমডিসহ মোট পাঁচজন কোম্পানিটির শীর্ষপদ পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে এর মধ্যে সর্বাধিক সক্রিয় গাজীপুর অঞ্চলে তিতাসের ডিএমডির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আবদুল ওহাব। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বপ্ন থাকতেই পারে সে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা অবশ্য বিচার্য বিষয়। আমি মনে করি আমার সেই যোগ্যতা আছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ যদি আমাকে যোগ্য মনে করে নির্বাচন করে তা হলে আমি এমডি হতেই পারি।

এদিকে আব্দুল ওহাবের বিরুদ্ধে গাজীপুরের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন ও বেসরকারি কোম্পানিকে অনৈতিকভাবে গ্যাসের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে তিতাসেরই একটি পক্ষ। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সুজাত আলী এবং ক্রয় বিভাগের উপব্যবস্থাপক মাহমুদুল আলমকে (তারেক শিকদার) নিয়ে একটি সিন্ডিকেট করার অভিযোগও রয়েছে। গত এপ্রিলে ‘তিতাসে শিকদার সিন্ডিকেটের রাজত্ব’ নামে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় জাতীয় একটি দৈনিকে। প্রতিবেদনে তাদের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁসের খবর তুলে ধরা হয়। ওই অডিও রেকর্ডে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবি এবং তিতাসের এমডি পদ নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক কথোপকথন উঠে আসে। এমন একটি অডিও রেকর্ড আমাদের সময়ের হাতেও এসেছে।

তিতাসের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ক্রয়বিভাগের উপব্যবস্থাপক নিজেকে ঢাকার এক প্রভাবশালী এমপির লোক হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় অন্য কর্মকর্তারা তার ভয়ে তটস্থ থাকেন। এসব বিষয় নিয়ে তারেক শিকদারের সঙ্গে গতকাল তিতাস কার্যালয়ে কথা বলতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে এমন অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল ওহাবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য নয়।

বর্তমান এমডি (চলতি দায়িত্ব) মীর মশিউর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে। তিনিও আছেন এমডি পদের লড়াইয়ে। তার বিরুদ্ধেও নানারকম দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে অন্যান্য গ্রুপ থেকে। এ বিষয়ে মীর মশিউর বলেন, আমি দায়িত্বে থাকাকালীন তিতাস সর্বাধিক সফলতা অর্জন করেছে; রাজস্ব আদায় বেড়েছে; অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যম তিতাসে ঘুষের লেনদেন নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এই একই রিপোর্ট একটি টিভি চ্যানেলে প্রায় এক বছর আগে করা হয়েছে। সেই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দুটি তদন্ত কমিটি করেছে। কমিটি অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। সেই রিপোর্ট এক বছর পর আবার প্রকাশ করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মীর মশিউর বলেন, আমাকে এমডি পদ থকে সরাতে তিতাসেরই একটি সিন্ডিকেট খুবই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ আমি এমডির দায়িত্বে থাকাকালেই তিতাস সর্বাধিক সফল।

এমডি পদের লড়াইয়ে আছেন সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির বর্তমান এমডি মো. মোস্তাক আহমেদও। দীর্ঘ সময় তিতাস গ্যাস কোম্পানির কোম্পানি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, সম্প্রতি একটি দৈনিকে আমার নাম জড়িয়ে রিপোর্ট করা হয়েছে। আমি সত্যিই দুঃখিত, মর্মাহত। কারণ তিতাসের কোম্পানি সচিব থাকাকালীন আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ওঠেনি। অথচ এখন উঠছে।

এটা পরিষ্কারভাবেই উদ্দেশ্যমূলক যেন আমি তিতাসের এমডি হতে না পারি। এ কর্মকর্তা বলেন, এখন আমাকে এমডি হিসেবে কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত করলেও যাব না। আমি নোংরামির মধ্যে নেই। মোস্তাক আহমেদ খেদের সঙ্গে বলেন, তিতাসে কিছু লোক এত বেশি প্রভাব খাটায়, এত বেশি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত যে, তিতাসে চাকরি করাটা একটা শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও একাধিক সূত্র বলছে, মোস্তাক আহমেদ মুখে যা-ই বলুন না কেন, তিনিও এমডি পদে বসতে আগ্রহী।

এমডি পদের দৌড়ে আরও রয়েছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএমডি মশিহুর রহমান। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমান এমডির পর সবচেয়ে সিনিয়র আমি। আমি দীর্ঘদিন এ কোম্পানিতে চাকরি করছি। কিন্তু আমাকে সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। যোগ্যতার বিচারে আমাকে এমডি পদ দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, তিতাসে খুব নোংরামি হচ্ছে। কয়েকটি চক্র বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে; নানা ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, যে-ই এমডি হোক, সে যেন তিতাসেরই লোক হয়, এটাই প্রত্যাশা।

এদিকে পেট্রোবাংলা চাইছে না তিতাসের কোনো কর্মকর্তাকে এমডি পদে বহাল করতে। পেট্রোবাংলার জিএম মো. লুৎফর রহমানকে ইতিপূর্বে তিতাসের এমডি হিসেবে নিয়োগ দিতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সুপারিশ করেছিলেন। তবে প্রস্তাবে মন্ত্রণালয়ের সম্মতি মেলেনি। পরবর্তী সময়ে লুৎফর রহমানকে সিলেট গ্যাসফিল্ডের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয় পেট্রোবাংলা।

তিতাসের এমডি নিয়োগের বিষয়ে গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লার কাছে জানতে চাইলে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, একবার আমরা একটা পরীক্ষা নিয়েছিলাম এডিবির নির্দেশনায়। তবে সেই সময় নেওয়া সব প্রক্রিয়া বর্তমানে বাতিল হয়ে গেছে। কে হবেন তিতাসের পরবর্তী এমডি, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। পেট্রোবাংলা যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এর পর আপনারাও জানতে পারবেন।

তিতাস কার্যালয়ে গতকাল এক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তিতাসকে নিয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশ হচ্ছে, তাতে করে বাইরের কারও কাছে পরিচয় দিতেও বিব্রত লাগে যে, আমি তিতাসের কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, যখন কেউ জানতে পারেন যে আমি তিতাসের কর্মকর্তা, তখন প্রশ্ন রাখেন, ‘ঢাকা শহরে আপনার কয়টি বাড়ি?’ তখন আমি ভীষণ লজ্জিত, কুণ্ঠিত হই। শুধু ওই প্রকৌশলী বা কর্মকর্তাই নন, সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই তিতাসের দুর্নীতির খবর লোকের মুখে মুখে শুনে বিব্রত। তাদের এই বিব্রতবোধ অনেক বেড়ে গেছে সম্প্রতি এমডি পদ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি এবং এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের জেরে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে