বাধ সাধছে বিকল্পধারা

  নজরুল ইসলাম

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:৩০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরোনো ছবি
জামায়াতে ইসলামীতে আপত্তি, বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে নেতৃত্বে রাখতে ‘জেদ’ ধরা, নির্বাচনী আসন বণ্টনসহ বিকল্পধারার কয়েকটি শর্তে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় জটিলতা বাড়ছে। ২০-দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দিতে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গড়তে বিকল্পধারার ‘আন্তরিকতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের জটিলতার জন্য বিকল্পধারা সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরীকে দায়ী করা হচ্ছে।

ক্ষমতার ভারসাম্যের নামে দেড়শ আসন চেয়ে বিএনপিকে যে প্রস্তাব দিয়েছেন মাহী, তাতে ঐক্য প্রক্রিয়ার দলগুলোর মধ্যেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। নির্বাচনে জয়ী হলে মালয়েশিয়ার মতো দুই বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকার কথাটাও ঐক্যের পথে বাধাই মনে করছেন নেতাকর্মীরা। গত কয়েক দিন ধরে বিকল্পধারার এসব শর্তে বিএনপি নেতাকর্মীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। দলের ভেতর থেকে দাবি উঠেছে, বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে। এ নিয়ে বিএনপি জোটের কয়েকজন নেতাও ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছেন। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে শুক্রবার এলডিপি তাদের বক্তব্য তুলে ধরবে।

ঐক্যপ্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার মতিঝিলের চেম্বারে বিভিন্ন বিষয়ে এই প্রতিবেদকের আলাপ হয়। তার কাছে প্রশ্ন ছিল দেড়শ আসন, দুই বছরের জন্য ক্ষমতা প্রসঙ্গে আপনার মত কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো কোনো সমস্যা নয়।’ তিনি যে ঘোষণাপত্র দিয়েছেন, তাতে জামায়াত নিয়ে কোনো বক্তব্য ছিল না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য আমাদের সময়কে বলেন, কারও বাড়িতে আগুন লাগলে বাড়ির মালিক জোরে জোরে চিৎকার করবে, আগুন নিভানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাবে এটাই স্বাভাবিক?

এ সময় কি প্রতিবেশীরা আগুন না নিভিয়ে শর্ত দেবেন? বিকল্পধারা বাংলাদেশের বক্তব্য শুনলে মনে হয় তারা ‘চিপায়’ পড়েছে। না পারছে ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকতে, না পারছে সরকারের সঙ্গে থাকতে। ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে না থাকলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিকল্পধারা একঘরে হয়ে পড়বে।

জানা গেছে, ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ আছে। প্রক্রিয়ায় বিএনপির যুক্ত হওয়া নিয়ে জামায়াতের কোনো আপত্তি নেই। এ প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াত আমাদের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত আছে।

বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, বিকল্পধারা শর্ত দিয়ে সরকারের উদ্দেশ্য হাসিল করছে। এটা ২০ দলের নেতৃত্বকারী দল বিএনপিকে বুঝতে হবে। বুঝতে ব্যর্থ হলে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা আলোচনা করেছেন। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও একাধিকবার বি. চৌধুরী ও মাহী বি. চৌধুরীর বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে কথা হয়। ঐক্যের স্বার্থে কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা না বললেও দিন দিন পরিস্থিতি একটু ভিন্ন দিকে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আমাদের সময়কে বলেন, বিকল্পধারার নাম দেখলেই বোঝা যায়, তাদের চিন্তায় বিকল্প কিছু থাকবে। তাই মনে হয়, তারা নানা শর্ত দিচ্ছে। কিন্তু যুক্তফ্রন্টে অন্য দলগুলোর মত এক কিনা বুঝতে হবে। এটা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করতে পারবে ঐক্য প্রক্রিয়া তত তাড়াতাড়ি হবে।

জানা গেছে, বিকল্পধারার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে যুক্তফ্রন্টের অন্য দলগুলোর। তাদের কয়েকজন আমাদের সময়কে বলেন, বৃহৎ জাতীয় ঐক্যে জামায়াত থাকছে না। বিএনপি জোটগতভাবে নয়, একাই আসছে। তা হলে কেন এই ধরনের শর্ত?

বিএনপি জোটের নেতারা বলছেন, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব) আবদুল মান্নানের বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন বলে খবর এসেছে। তা হলে বিকল্পধারা কেন তাকে আগে বাদ দিচ্ছে না?

বিএনপি ও তার শরিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য, দেশে আজ গণতন্ত্রহীন অবস্থা। সবারই দাবি থাকা উচিত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্যেই কাজ করা। কিন্তু এটাকে মূল ফোকাস না করে নানা শর্ত সংবলিত বক্তব্য দিচ্ছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের নেতারা।

গতকাল বিকালে পেশাজীবীদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বি. চৌধুরী অথবা মাহী বি. চৌধুরীকে দেখা যায়নি। এই অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন বলেন, যে কোনো মূল্যে এই ঐক্য গড়ে তুলব, ধরে রাখতে হবে। বৈষম্য দূর করে আইনের শাসন গণতন্ত্র মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

২০-দলীয় জোটের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এক নেতা বলেন, আমাদের দল পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। কারণ বিকল্পধারা বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের পাশাপাশি তার ব্যবসাও রয়েছে। সঙ্গত কারণে মাহীর সিদ্ধান্তের বাইরে তার বাবা বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও যেতে পারবেন না। তারা কোনো অবস্থায় বিএনপি বা ২০-দলীয় জোটের ভালো চাইবে না। বরং তাদের উদ্দেশ্য ২০-দলীয় জোটকে ভেঙে জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়া।

বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা বাংলাদেশ, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট। এই ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিএনপি নেতারা বলেন, আবদুর রব ও মান্নাও পরিবর্তন চান। গণতন্ত্র ফেরাতে রাজপথে নামতে চান। কিন্তু বিকল্পধারার নেতাদের মনোভাব একটু ভিন্ন।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিকল্পধারা ঢাকা মহানগর উত্তর, মহানগর দক্ষিণ এবং অঙ্গসংগঠনের মধ্যে বিকল্প যুবধারা, বিকল্প শ্রমজীবীধারা, বিকল্প স্বেচ্ছাসেবকধারা, প্রজন্ম বাংলাদেশের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন মাহী বি. চৌধুরী। এই বৈঠক শেষে মাহীর বৈঠকে নেওয়া প্রস্তাবনা বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরীকে দেওয়া হয়। এ বৈঠক প্রসঙ্গে মাহী সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে আমরা জাতীয় ঐক্য করতে চাই। তবে স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল বা ব্যক্তিকে শরিক রাখলে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে আমাদের আপত্তি রয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী দল ও ব্যক্তির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত না করার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। এজন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব জাতীয় নেতাদের চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে একই মঞ্চে না বসবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এমএম আমিনুর রহমান বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, সরকারি জোটের বাইরে নিবন্ধিত সব দলের অংশগ্রহণ এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে একটি ঐক্য হলে ভালো হতো। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি এই ঐক্যের তালিকায় নিবন্ধিত দলের সংখ্যা চারটি, তা হলে বাকি দলগুলো কোথায়? তারা কীভাবে ঐক্যের সঙ্গে থাকবে তার কোনো ঘোষণা নেই। শুধু জাতীয় ঐক্যের কথা বললে হবে না কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না করে আগে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে