‘অনৈক্যে’ই ৭ দফা ১১ লক্ষ্য চূড়ান্ত

জোটের নাম হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট # সমন্বিত কর্মসূচি চূড়ান্ত হলেই ঘোষণা

  হাসান শিপলু

১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ১০:১০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আসন বণ্টন এই দুই বিষয়ে ‘অনৈক্যে’র মধ্যেই ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য চূড়ান্ত করেছে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। এদের সমন্বয়ে যে বৃহৎ ঐক্যের আত্মপ্রকাশ ঘটবে তার নাম হবে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’। চলতি সপ্তাহের মধ্যে দাবি ও লক্ষ্য জানিয়ে এ নাম ঘোষণা করা হবে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

এখন সমন্বিত কর্মসূচি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। আজ শুক্রবার আ স ম রবের বাসায় বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। আজকালের মধ্যে ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের পর এ জোট চূড়ান্ত রূপ নেবে।

জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ৭ দফা দাবিতে রাখা নিয়ে এক সময় কয়েকটি দলের অনাগ্রহ থাকলেও এখন তা আর নেই। তার মুক্তির বিষয়টি প্রথম দাবিতে রেখে দফা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত দলগুলো বলছে, ক্ষমতার ভারসাম্য ও আসন বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় আনছে ডা. একিউএম বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশ। যুক্তফ্রন্টেরও নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। অন্য দলগুলো বিষয়টিকে এ মুহূর্তে গৌণ মনে করছে। তাদের মতে, এখন ক্ষমতার পালাবদল হওয়া দরকার। নির্বাচনের বিষয়টি পরে আসবে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে ধারাবাহিক বৈঠক করছি। দ্রুত জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এখন সমন্বিত কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ড. কামাল হোসেনের আহ্বানেই ঐক্য প্রক্রিয়ার কাজ চলছে।

যুক্তফ্রন্টের শর্ত নিয়ে সুব্রত চৌধুরী বলেন, যৌথসভায় এ ধরনের শর্ত আলোচনা আসেনি। গণমাধ্যমে আমরা দেখেছি। যদি এ ধরনের শর্ত আমাদের দেওয়া হয়, তা আলোচনায় আসতে পারে।

যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনে বিএনপি দুই মাস ধরে কাজ করছে। এ প্রক্রিয়া এখন প্রায় শেষের পথে। বিএনপি ও অন্য দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি লিয়াজোঁ কমিটি গত ১০ দিনে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। গত ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেন নেতারা।

ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শীর্ষনেতারা গতকাল বলেছেন, তাদের লক্ষ্য সুষ্ঠু নির্বাচন। এ জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ক্ষমতায় গেলে কীভাবে সরকার পরিচালিত হবে কিংবা আসন বণ্টনের বিষয়টির সুরাহা কীভাবে হবে তা এখনই মুখ্য নয়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামার আগেই শর্ত জুড়ে দিলে তা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে নাও পৌঁছাতে পারে।

ওই নেতা বলেন, বিকল্পধারার নেতা মাহি বি চৌধুরী কিংবা বিকল্পধারার পক্ষ থেকে আসন বণ্টন নিয়ে যে ধরনের শর্তের কথা বলা হচ্ছে, এটা তাদের দলগত আলোচনা। এটা ঐক্যের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এ ধরনের শর্ত আগেভাগে জুড়ে দেওয়ায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেও ওই নেতা জানান।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মনসুর বলেন, কে কী শর্ত দিল তা আমাদের বিষয় নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য ঐক্য করা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আন্দোলন করব।

নাগরিক ঐক্যের নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার বলেন, আমাদের কাজ শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্য চূড়ান্ত হয়েছে। জোটের নামও চূড়ান্ত হয়েছে। এখন সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পর শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হবে। তারপর সংবাদ সম্মেলন করে বৃহৎ ঐক্যের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।

৭ দফায় যা রয়েছে

১. সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা; ২. যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা; ৩. নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নির্শ্চিত; ৪. শিক্ষার্থী-সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সব কালো আইন বাতিল; ৫. নির্বাচনের ১০ দিন আগে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন; ৬. দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; ৭. তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা না দেওয়া।

১১ লক্ষ্য

১. মুক্তি সংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন; ২. ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন; ৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত; ৪. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা; ৫. দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি; ৬. সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চয়তার বিধান; ৭. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন;

৮. রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা নিশ্চিত, জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, নি¤œ আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবন মান নিশ্চিত করা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বেতন-মজুরি কাঠামো নির্ধারণ; ৯. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া;

১০. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সাথে শত্রুতা নয়’ এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ; ১১. বিশ্বের সব নিপীড়িত মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে