প্রস্তুতির প্রথম বৈঠকেই ইসিতে অস্থিরতা

  আসাদুর রহমান

১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম প্রস্তুতি বৈঠকেই অস্থিরতা দেখা গেছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদাসহ সহকর্মী কমিশনারদের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলে কমিশন সভা বর্জন করেছেন মাহবুব তালুকদার। পরে সিইসি অন্য কমিশনারদের নিয়ে বৈঠক শেষ করেন। বৈঠকে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সংসদ নির্বাচনের জন্য ৭শ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়ে ইসি সচিবালয়কে নির্দেশনা দেন কেএম নুরুল হুদা কমিশন।

বৈঠকশেষে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। আমরা সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি। কোনো ভুলত্রুটি থাকলে আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে কমিশনকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। ৩০ অক্টোবরের পর যে কোনো সময় তফসিল ঘোষণা করা হবে।

সিইসি কেএম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে চার নির্বাচন কমিশনার সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার, সাবেক সচিব মো. রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ বেগম কবিতা খানম ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী ও ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সকাল ১১টায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকের শুরুতেই ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ও অংশীদারত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাবনা’ শিরোনামে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে চান। এ প্রস্তাবনা আগেই সিইসি

ও নির্বাচন কমিশনারদের কাছে গেলে তারা এটি কমিশন সভায় উপস্থাপনে দ্বিমত পোষণ করেন। এমন পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন ধারণা করে আগে থেকেই তৈরি করা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সভা বর্জন করেন মাহবুব তালুকদার। এর আগেও তিনি ইভিএমের বিরোধিতা করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন। সম্প্রতি সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ইসি সচিবালয়ের সব পদক্ষেপ জানতে চেয়ে ইউনোট (আন অফিসিয়াল নোট) দিয়েছিলেন চার নির্বাচন কমিশনার। পরে সব ফাইল কমিশনারদের কাছে উপস্থাপনের লিখিত নির্দেশনা জারি করে ইসি সচিবালয়। এ নিয়ে সিইসি ও সচিবের সঙ্গে কমিশনারের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে জানান ইসি কর্মকর্তারা।

গতকাল কমিশন বৈঠকশেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন মাস নির্বাচন কমিশন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করে। এতে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুশীল সমাজ, মিডিয়া, পর্যবেক্ষণকারী, নারীনেত্রী প্রমুখ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। এই সংলাপ ছিল একপক্ষীয়। ইসি তাদের বক্তব্য শোনা ছাড়া নিজেদের কোনো মতামত প্রকাশ করেনি। সবার সংলাপ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হলেও সংলাপের সুপারিশ বা প্রস্তাব সম্পর্কে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি বলেন, সংলাপের কার্যকারিতা না দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি উক্ত সংলাপ পর্যালোচনা করে কমিশন সভায় কতিপয় প্রস্তাব পেশ করতে চেয়েছি এবং কমিশনের মধ্যেই আমি তা সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছি। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশীদারত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাবনা শিরোনামে আমি যা আলোচনা করতে চেয়েছিলাম, আমাকে নির্বাচন কমিশন সভায় তা উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। অথচ গত ৮ অক্টোবর ইসি সচিবালয় থেকে ইউনোটের মাধ্যমে আমাকে আজকের সভায় তা উপস্থাপনার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। আমাকে আমার প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে বলে তা করতে না দেওয়ায় আমি অপমানিত বোধ করেছি। তিনি বলেন, বাক প্রকাশের স্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান প্রদত্ত আমার মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এ অধিকার খর্ব করতে পারে না। এমতাবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে আমি নির্বাচন কমিশনের এ রকম সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি এবং এর প্রতিবাদস্বরূপ নির্বাচন কমিশনের সভা বর্জন করেছি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, নির্বাচনে নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকারের সঙ্গে সংলাপÑ এ পাঁচটি বিষয়ে তিনি কমিশন সভায় কথা বলতে চেয়েছিলেন। প্রস্তাবনায় সেনা মোতায়েন বিষয়ে মাহবুব তালুকদার বলেন, আগের নির্বাচনগুলোয় সেনাবাহিনীর মূল্যায়ন করে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কীভাবে তাদের ব্যবহার করা যায় তা ঠিক করতে হবে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বিষয়ে এই কমিশনার বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে নির্বাচনে অনিয়মের পথ বন্ধ হয়। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না হলে তা গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশকে সমর্থন করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশন দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারে।

নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বিষয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনে নিরপেক্ষতা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর নির্ভর করে। নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যদের নিষ্ক্রিয় রাখা নির্বাচন কমিশনের একার ওপর নির্ভর করে না। এতে সরকারের সহযোগিতার দরকার হয়।

ইসির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগে সীমাবদ্ধতাও আছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোয় দেখা গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতায় কমিশন ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর খুব একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কীভাবে আরও নিয়ন্ত্রণাধীন করা যায়, তা দেখা উচিত।

সরকারের সঙ্গে সংলাপ বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার নির্বাচন কমিশনের বড় অংশীজন। সংলাপে দেখা যায়, কিছু বিষয় রাজনৈতিক বা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ আবশ্যক।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার শুরুতেই এই নির্বাচন কমিশনার শর্ত জুড়ে দেন, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

কমিশন সভা শেষে ইসি সচিব যখন সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, তখন নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলামের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম ও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) শাহাদত চৌধুরী। সিইসি ছিলেন নিজ কার্যালয়ে।

এদিকে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সভা বর্জন করলে তাতে কোনো বিঘœ ঘটেনি বলে দাবি করেছেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নে সচিব বলেন, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বৈঠকের এজেন্ডায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলেছিলেন। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় প্রথমে তিনি বৈঠকে যোগ দিলেও পরে বর্জন করেন। আশা করি আগামী বৈঠকগুলোয় সব কমিশনারই উপিস্থত থাকবেন।

নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, ৪০ হাজার ১৯৯টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত রাখা হয়েছে যদি দুর্বিপাকের কারণে অন্যত্র সরাতে হয়। তফসিল ঘোষণার পর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

সচিব বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭শ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে খাতভিত্তিক ব্যয়ের জন্য নির্বাচন কমিশন অনুমোদন দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এবারই প্রথমবারের মতো অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মনোনয়নপত্রে হিজড়াদের (তৃতীয় লিঙ্গের) জন্য আলাদা কোনো কলাম থাকবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য আগের নিয়মই বহাল থাকছে।

ইভিএম নিয়ে সচিব বলেন, নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং (ইভিএম) মেশিন ব্যবহারের প্রস্তুতিও থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকারেরর কাছে আইন সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আইন সংশোধন হলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

আগামী ২৭ অক্টোবর দেশের নয়টি স্থানে এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে ২ দিনব্যাপী ইভিএম মেলার আয়োজন করা হবে বলে জানান ইসি সচিব।

হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। বিশেষ করে ফেমবোসা অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর কর্মকর্তাদের আমরা বিশেষ আমন্ত্রণ জানাব। তিনি বলেন, নির্বাচনে ফল প্রকাশে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অনলাইন এবং নিজস্ব সিস্টেমের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনবল বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে আমাদের প্রচুর লোকবলের প্রয়োজন হয়। এজন্য বিভিন্ন সংস্থা থেকে লোকবল সংগ্রহ করা হবে। ইতোমধ্যে সরকারের কাছে মাঠ পর্যায়ে পদ ফাঁকা না রাখতে ইসির নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

তফসিল ঘোষণা কবে, এমন প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, সভায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে কমিশন সভায় আলোচনা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার

চলতি মাসের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। ১০ দিনের এই সফরকে ব্যক্তিগত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাবেন বলে জানানো হয়। এই সফরের ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করবেন। ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আগামী ২০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। তিনি ১০ দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন। সেখানে তার কন্যা আইরিন মাহবুবের বাসায় অবস্থান করবেন বলে জানানো হয়েছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে