নির্বাচন কমিশনে কী হচ্ছে

  আসাদুর রহমান

১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রস্তুতির মধ্যেই কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ দিনে দিনে স্পষ্ট হচ্ছে। এ বিরোধ ক্রমেই বাড়ছে। বিগত দুমাসে এককভাবে দুটি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কমিশনসভা বর্জন করেন এক কমিশনার। এ সময়ের মধ্যে চারজন কমিশনার এক হয়ে আন অফিসিয়াল নোটও (ইউনোট) দিয়েছেন।

সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সভায় সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলে সভা বর্জন করেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। এ নিয়ে বর্তমানে সরগরম ইসি।

নিজেদের মধ্যে বিরোধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানম বলেন, কমিশনে পাঁচজন কমিশনার আছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে। কারও ভিন্নমত থাকতে পারে। সেটাকে কমিশনারদের বিরোধ বলা যাবে না। তিনি আরও বলেন, মাহবুব তালুকদার কমিশনের সভা ত্যাগ ও তার দেওয়া নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেছেন। বাইরে প্রচার হয়েছে, কমিশনে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমরা তা মনে করি না।

মাহবুব তালুকদারের প্রস্তাব প্রসঙ্গে কবিতা খানম বলেছেন, সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা বিশেষ কোনো মন্ত্রণালয়কে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে ন্যস্ত করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে প্রস্তাব করেছেন তা সংবিধানসম্মত নয়। মাহবুব তালুকদার জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে। সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে এ ক্ষমতা দিয়েছে। তাই কোনো মন্ত্রণালয়কে কমিশনের অধীনে আনতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

মাহবুব তালুকদারের বাকি প্রস্তাবনা বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইতোমধ্যে সংলাপ করেছি। যতটুকু সময় আমাদের আছে এ সময়ের মধ্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার সময় মনে হয় না ইসির হাতে আছে। এ ছাড়া নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

ইসির সভায় মাহবুব তালুকদারের নোট অব ডিসেন্ট সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, নোট অব ডিসেন্ট হয় কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেদিন কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত ছিল না। সুতরাং মাহবুব তালুকদার যা দিয়েছেন সেটিকে নোট অব ডিসেন্ট বলা যাবে না।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ও অংশীদারত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষে কতিপয় প্রস্তাবনা’ শিরোনামে ৫টি প্রস্তাবনা কমিশন সভায় উপস্থাপনের বিরোধিতা করে তিনজন কমিশনার সিইসি বরাবর ইউনোট দেন।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম তার ইউনোটে বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। সংবিধান, আইন ও বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণের অবকাশ নেই। প্রস্তাবিত প্রস্তাবনায় যেসব বিষয় তুলে ধারা হয়েছে তার অনেকই সংবিধান এবং বলবৎ আইন বিধিবিধানের পরিপন্থী এবং উপস্থাপিত বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যনির্ভর নয়। তাই এ ধরনের একটি প্রস্তাবনা কমিশন সভায় আলোচনা করা যথাযথ হবে মর্মে আমি মনে করি না।

নোটে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং তার কার্য-পরিধি তফসিল ঘোষণার আগেই নির্ধারণ করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা এ পর্যায়ে বিবেচনা করা যথাযথ হবে মর্মে মনে করি না। সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তফসিল ঘোষণার পর বিষয়টি যথাযথ হবে। অপর দুই নির্বাচন কমিশনারের ইউনোটও প্রায় একই ভাষায় লেখা বলে জানায় ইসি সূত্র।

এদিকে কমিশনসভা সূত্র জানায়, কমিশনসভার শুরুতে এজেন্ডাগুলো নিয়ে আলোচনার প্রথমে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে চান। কিন্তু তিন নির্বাচন কমিশনার তার এ প্রস্তাবনা সভার এজেন্ডাভুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ইউনোট দেন। সভায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হোক সেটি তারা চান না, আমি নিজেও তাদের সঙ্গে একমত। ফলে এ প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে এজেন্ডার বাইরে বিধিতে তিনি এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। জবাবে মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি কিছু বলতে চাই। তখন সিইসি সংক্ষেপে তাকে কিছু বলার অনুরোধ জানান। এ সময় তিনি অপমানিত হয়েছেন এবং তার বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা বর্জন করেন।

এদিকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। তফসিল ঘোষণা নিয়ে আগামী সপ্তাহে কমিশনসভা করবে কেএম নুরুল হুদা কমিশন। সেই সভায় থাকছেন না নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। এ ছাড়া ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে যে কোনো একদিন রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ চেয়েছেন সিইসিসহ পাঁচ নির্বাচন কমিশনার। এ সময়ের মধ্যে সাক্ষাতের সময় চূড়ান্ত হলে সেই সাক্ষাতে অংশ নিতে পারবেন না মাহবুব তালুকদার। আগামী ২০ থেকে ৩০ অক্টোবর ব্যক্তিগত সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন।

নোট অব ডিসেন্টের পর মাহবুব তালুকদারকে নিয়ে সরগরম ইসি। কমিশনের বাইরে রাজনৈতিক দল থেকে তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের পদত্যাগ দাবি করে ক্ষমতাসীন ১৪ দল। জোটের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, মাহবুব তালুকদার সাংবিধানিক পদে থেকে অসাংবিধানিক কথা বলায় তার দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া উচিত।

গত ৩০ আগস্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধন নিয়ে কমিশনসভা চলাকালে বৈঠক বর্জন করেছিলেন মাহবুব তালুকদার। এর পর সংসদ নির্বাচনের সবকিছু জানতে চেয়ে চার কমিশনার এক হয়ে আন অফিসিয়াল (ইউনোট) নোট দেন। পরে ইসি সচিবালয়ের এক আদেশে জানানো হয়, একাদশ সংসদ নির্র্বাচন কেন্দ্র করে সব বিষয়ে তাদের অবহিত করা হবে।

৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষভাবে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। সে ক্ষেত্রে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে