চলছে ভাঙাগড়ার খেলা

  নজরুল ইসলাম

১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতিতে ভাঙা-গড়ার খেলা ততই বেড়ে যাচ্ছে। ভোটের সমীকরণ মেলাতে চলছে নতুন নতুন মেরুকরণ; পুরনো জোট ভেঙে হচ্ছে নতুন জোট। আবার নতুন জোট গড়তে গিয়ে দলের ভেতরেও নেতায়-নেতায় বাড়ছে দ্বন্দ্ব, সৃষ্টি হচ্ছে বিভক্তি, ভাঙছে দল।

ভোটের সমীকরণই শুধু নয়, এসব ভাঙা-গড়ার নেপথ্যে ক্ষেত্রবিশেষে কাজ করছে নেতাদের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ও পরস্পরের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভও।

এ ছাড়া দল বা জোট ভাঙার নেপথ্যে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রকেও দায়ী করা হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, ভাঙা-গড়ার এই খেলা দেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। নির্বাচন এলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলগুলোর মধ্যে এই খেলা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

ভাঙা-গড়ার এই খেলা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ক্ষেত্রে। শেষ মুহূর্তে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারাকে ছাড়াই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ার ঘোষণা আসায় এ জোটের ভেতরের আরেক জোট যুক্তফ্রন্ট অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কারণ এ জোটের বাকি সবাই ঐক্যফ্রন্টে চলে গেছে। এদিকে দুদিন আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট থেকে ছোট যে দুটি দল বেরিয়ে গেছে, তাদের একটি বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে, অপরটি সরকারি জোটে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে বিএনপির অভিযোগ, চাপে ফেলে অথবা লোভ দেখিয়ে সরকার ষড়যন্ত্র করছে তাদের দল, জোট এমনকি নবগঠিত ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার। দলটি মনে করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্যই আওয়ামী লীগ এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও এর জোটসঙ্গী নেতাদের মতে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে বিএনপি নতুন যে জোট করেছে, তা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রেরই অংশ।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যেন না হয়, আত্মপ্রকাশের আগে সরকারের দিক থেকে নানা ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতারা সতর্ক থাকার কারণে গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। বিএনপি নেতাদের কাছে তথ্য আছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে বাধা দিয়ে সরকার সফল না হওয়ায় চাপ ও লোভ দেখিয়ে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ন্যাপ ও এনডিপি একাংশ ২০-দলীয় জোট থেকে বের করতে সক্ষম হয়েছে। এ ধরনের চেষ্টা আরও করবে। তবে বিএনপি এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, নিজেদের দোষত্রুটি ঢাকতে বিএনপির এসব অজুহাত পুরনো। ভাঙন কেবল শুরু। বিএনপির ত্রুটি ও অন্তর্কোন্দলের কারণে গণতন্ত্রমনা কোনো দলই তাদের সঙ্গে থাকতে পারে না, থাকবেও না।

এদিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের গত মঙ্গলবার বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ন্যাপ ও এনডিপিÑ এ দল দুটির একাংশের নেতারা। ন্যাপের একাংশ দল থেকে বহিষ্কার করেছে চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়াকে। ২০-দলীয় জোটে থাকার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ ন্যাপের সাংগঠনিক সম্পাদক এমএন শাওন সাদেককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়েছে।

এনডিপির একাংশও ২০-দলীয় জোটে থাকার ঘোষণা দিয়ে চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসাকে বহিষ্কার করেছে। বাংলাদেশ ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া এ জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপির কি এতই খারাপ সময় যাচ্ছে যে, অন্য দলকে ভেঙে ২০-দলীয় জোটে রাখতে হবে? দলটির একাংশের ঘোষণা অনুযায়ী, সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল মুকাদ্দিমকে চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব ওসমান গনি পাটোয়ারীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে।

২০-দলীয় জোটের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আপনারা নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস শেষের কবিতা পড়েছেন। শেষের কবিতায় আছে ‘আমরা সবাই চলতি হাওয়ার পন্থি।’ অনেকে এই চলতি হাওয়ার পন্থি থাকে আর কি! মনে করছে যে, বিএনপির জোটের কী হবে না হবে। কোথাও থেকে কিছু বৈষয়িক লাভ হয়ে যেতে পারে। তাদের এই মনে করার কারণে ২০-দলীয় জোট ভাঙছে না। দু-একটি দলের দু-একজন নেতা চলে গেলেও তাদের দল ২০-দলীয় জোটে থাকছে। দলগুলোর ইতোমধ্যেই গৃহীত সিদ্ধান্তে তাদের বহিষ্কারও করা হয়েছে। ২০-দলীয় জোট অটুট আছে। এতে কোনো সংশয় নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহম্মেদ আমাদের সময়কে বলেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের জোট-উপজোট গঠনের তৎপরতা আমরা দেখতে পাই। ছোট ছোট দলগুলো নির্বাচনের আগে এসব জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতীয় রাজনীতিতে এসব জোটের গুরুত্ব আছে।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনের পরিবেশ ভিন্ন। এবার সব দলই নির্বাচনমুখী। এটি একটি ভালো দিক বলে মনে করেন তিনি। সরকার-বিরোধী জোট নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেসব দাবি করছে, সেসব পূরণ হবে কিনাÑ এমন প্রশ্নে ড. ইমতিয়াজ আহম্মেদ বলেন, আমার মনে হয় না, বিরোধী জোটের সব দাবি সরকার মেনে নেবে। বিরোধী জোটও জানে, তাদের সব দাবি পূরণ হবে না। তবে সরকারকে যতটা সম্ভব চাপে রেখে সুবিধা আদায় করে নিতে চায় তারা।

বিশ্লেষকসহ রাজনীতি সচেতন মহলের মতে, সামনে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। প্রকাশ্যে অথবা অপ্রকাশ্যে এই দল দুটির সান্নিধ্য পেতে চায় অন্য দলগুলো। কিন্তু বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপট ভিন্ন, সে কারণে এখন কে কোন দিকে যাবে, কোন দল ভাঙবে, নতুনভাবে জোট গড়বে, এটা আগাম বলা সম্ভব নয়। স্থায়ী কমিটির দুই-এক নেতা অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতা বিএনপি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। ওয়ান-ইলেভেনেও এমন উদাহরণ আছে। এ ক্ষেত্রে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। অপেক্ষা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএনপির অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে মামলা রয়েছে। তাদের কারও কারও মামলা রায়ের পর্যায়ে আছে। পদ-পদবি নিয়ে কারও কারও ক্ষোভ রয়েছে। নতুন করে দেখা দিয়েছে মনোনয়ন পাওয়া, না পাওয়া নিয়ে নানা ক্ষোভ। ২০-দলীয় জোটের মধ্যেও এমন অসন্তোষ রয়েছে।

শরিক দলের নেতাদের অভিযোগ, তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর বিএনপির কোনো কোনো নেতা জোট নেতাদের সঙ্গে রীতিমতো খারাপ আচরণও করেছেন। খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পর যেভাবে কর্মসূচি হওয়া উচিত ছিল, তাও হয়নি। এ অবস্থায় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জোট নেতাদের মধ্যে যারা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, তাদের নিয়ে নানা গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে।

জনসমর্থন না থাকলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। বিশেষ করে, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি দলের মধ্যে ছোট দলগুলোকেও অনেক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে দেশে ১৪টি জোট আছে। বাম সংগঠনের আরেকটি জোট গঠন এখন পাইপলাইনে। তবে এসব জোট গড়তে গিয়ে বেশিরভাগ দলই তাদের আদর্শকে অনুসরণ করছে না। প্রগতিশীল দলগুলো ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়েও জোট করছে।

এ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে যে কারও সঙ্গে বিএনপি জোট করবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে