চির নীরবতার দেশে পাড়ি দিলেন আইয়ুব বাচ্চু

  জাহিদ ভূঁইয়া

১৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘যারা জন্মেছিল আমাদের বহুদিন আগে/ যারা দেবতার পুত্র, যারা সব দেবতার মতো/ তারাও পায়নি মুক্তি জরা থেকে/ দুঃখ থেকে/ তাদেরও জীবনে মৃত্যু এসেছিল একদিন।’Ñ মৃত্যুর হাত থেকে কারও নিস্তার নেই। আড়াই হাজার বছর আগে বিখ্যাত গ্রিক কবি সিমোনিদেস এই ধ্রুব সত্য তুলে ধরেছিলেন তার কবিতায়। মৃত্যুই অমোঘ সত্য। এই চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে। তবু কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের স্বতন্ত্র এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের গত চার দশকের প্রধানতম দূত আইয়ুব বাচ্চু গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)।

তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। পারিবারিক সূত্র জানায়, এদিন সকালে তার হার্ট অ্যাটাক হলে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সংবাদ সম্মেলনে স্কয়ার হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন জানান, হাসপাতালে পৌঁছার আগেই আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু হয়। সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছাপিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের সব অঙ্গনে।

২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর ফুসফুসে পানি জমার কারণে স্কয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) একবার ভর্তি হয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার গানে ফেরেন।

শোকগাথা

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শোকবার্তায় তিনি শিল্পীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এ ছাড়া শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতারা। জনপ্রিয় এই সংগীতশিল্পীর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বইছে শোকের বাতাস। তার মৃত্যু সংবাদে সকাল থেকেই হাসপাতালে ভিড় করেন অনেকে। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ, উপস্থাপক হানিফ সংকেত, কবি ও গীতিকার শহীদুল্লা ফরায়জী, অভিনেতা শংকর সাঁওজাল, আফজাল হোসেন, সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর, এন্ড্রু কিশোর, কুমার বিশ্বজিৎ, ফেরদৌস ওয়াহিদ, তপন চৌধুরী, রফিকুল আলম, তপন মাহমুদ, ফুয়াদ নাসের বাবু, প্রিন্স মাহমুদ, পার্থ বড়–য়া, রবি চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী, বাপ্পা মজুমদার, শুভ্রদেব, তপু, কনা, এলিটা, রুমি, কোনাল, মাহাদী, কাজী শুভ, অটমনাল মুন, আর্কের হাসান, আর্টসেল ব্যান্ডের লিংকন, প্রমিথিউসের বিপ্লব, ওয়ারফেইজের টিপু, অবসকিউরের সাঈদ হাসান টিপু, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, তাপস, অভিনেত্রী বন্যা মির্জা, চিত্রনায়ক ফেরদৌসসহ অনেকে।

শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন আজ

আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আজ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাখা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে জানাজা শেষে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে যাওয়া হবে চট্টগ্রামের পৈতৃক নিবাসে।

মায়ের পাশে চিরনিদ্রা

আইয়ুব বাচ্চু ও চন্দনা দম্পতির দ্ইু সন্তান। ছেলের নাম ফায়রুজ, মেয়ের নাম তাজওয়ার।

ফায়রুজ থাকেন কানাডায়, তাজওয়ার অস্ট্রেলিয়ায়। সদ্যপ্রয়াত এই সংগীতশিল্পীর মামাতো ভাই হামিদ হোসেন চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সময়কে জানান, ফায়রুজ ও তাজওয়ার ইতোমধ্যেই দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। আগামীকাল শনিবার আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ চট্টগ্রামে নেওয়া হবে। বাদ জোহর নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মজসিদ মাঠে জানাজা শেষে চৈতন্য গলির ২২ মহল্লা কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হবে। হামিদ হোসেন বলেন, পারিবারিকভাবে আমরা জানাজা ও দাফনের সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

আইয়ুব বাচ্চুর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। তবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নগরীর এনায়েতবাজারের বাড়িতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাচ্চুর বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ বেঁচে আছেন।

॥ গণমাধ্যমজুড়ে রুপালি গিটার ছেড়ে বাচ্চুর চলে যাওয়া

আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘এই রুপালি গিটার ফেলে/ একদিন চলে যাবো দূরে/ বহুদূরে...।’ সময়জয়ী এই গানকে সত্যি মেনে প্রিয় রুপালি গিটার ফেলে চিরদিনের জন্য তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গতকাল দেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে তাই তার প্রয়াণ-সংবাদের শিরোনামে স্থান পেয়েছে এ বিষয়টি। প্রথম আলো অনলাইনে করা বিশেষ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রুপালি গিটারের জ্বালা কি জুড়াল?’; বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের শিরোনাম ছিল, ‘রুপালি গিটার ফেলে চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু’; এনটিভি অনলাইনের শিরোনাম ছিল, ‘রুপালি গিটার ফেলে চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু’; বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে-বহুদূরে..’। এ ছাড়া বাংলা নিউজ, সময় টিভি, ঢাকা টাইমস, বাংলাদেশ টুডেসহ প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমের শিরোনামে ছিল রুপালি গিটার ছেড়ে কিংবদন্তি এই ব্যান্ড সংগীতশিল্পীর চিরবিদায়ের খবর।

বাচ্চুনামা

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড এলআরবির দলনেতা আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক। গিটারের জাদুকর হিসেবে আলাদা সুনাম ছিল তার। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘এবি’ নামে পরিচিত। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও আছে। ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত এই মিউজিক স্টুডিওটির নাম এবি কিচেন।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৭৮ সালে ফিলিংস ব্যান্ডের মাধ্যমে সংগীত জগতে তার পথচলা শুরু হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোলস ব্যান্ডে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে এলআরবি ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। এর প্রথম অ্যালবাম ‘এলআরবি’ বাজারে আসে ১৯৯২ সালে। এটাই দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম। এলআরবির অন্য অ্যালবামগুলো হলোÑ ‘সুখ’ (১৯৯৩), ‘তবুও’ (১৯৯৪), ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারি মন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের’ (১৯৯৮), ‘বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০১), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নাই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮), ‘যুদ্ধ’ (২০১২), ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ (২০১৬)।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’। তবে সাফল্যের শুরু দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ময়না’র (১৯৮৮) মাধ্যমে। ১৯৯৫ সালে বাজারে আসে তার তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এর প্রায় সব গানই জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ‘আমিও মানুষ’ গানগুলো। তার অন্য একক অ্যালবামগুলো হলোÑ ‘সময়’ (১৯৯৮), ‘একা’ (১৯৯৯), ‘প্রেম তুমি কি’ (২০০২), ‘দুটি মন’ (২০০২), ‘কাফেলা’ (২০০২), ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (২০০৮), ‘বলিনি কখনো’ (২০০৯), ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫)।

আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘চলো বদলে যাই’। এর কথা ও সুর তারই। শ্রোতাপ্রিয় গানের তালিকায় আরও রয়েছে ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’, ‘সুখ’, ‘রুপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’, ‘তারা ভরা রাতে’, ‘এখন অনেক রাত’ ইত্যাদি।

রক ঘরানার গানের এই শিল্পী আধুনিক আর লোকগীতিতেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া প্রথম গান ‘লুটতরাজ’ ছবির ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’। এ ছাড়া ‘আম্মাজান’ ছবির শিরোনাম গানও জনপ্রিয়।

‘হাসতে দেখ, গাইতে দেখ/ অনেক কথায় মুখর আমায় দেখ/ দেখ না কেউ হাসিশেষে নীরবতা...’ নিজের গাওয়া গানের মতো প্রিয় সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু হাসবেন না। হাসি দিয়ে আর ঢাকবেন না নীরবতা। চির নীরবতার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। কেউ কেউ চলে গেলে অধিক কিছু থেকে যায় তার না থাকা জুড়ে। আইয়ুব বাচ্চু দৃশ্যত আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেও কার্যত বাংলা ব্যান্ড গান যতদিন বেঁচে থাকবে, এর একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হিসেবে বেঁচে থাকবেন এই কিংবদন্তিও।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে