জমে উঠেছে নির্বাচনী কূটনীতি

ঐক্যফ্রন্টকে ৮ প্রশ্ন

নির্বাচনে যাবে? জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে

  আরিফুজ্জামান মামুন

১৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৫৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ব্রিফিংয়ে নিজেদের লক্ষ্য ও দফাগুলো তুলে ধরার পর কূটনীতিকরাও বিভিন্ন বিষয়ে আটটি প্রশ্ন করেছেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচন, আন্দোলন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জামায়াত নিয়ে ছিল এসব প্রশ্ন। রাজধানীর একটি হোটেলে বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে ব্রিফিং শুরু হয়ে চলে ঘণ্টাব্যাপী। ব্রিফিং শেষে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেননি ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

জানা গেছে, ব্রিফিংয়ের পর ঐক্যফ্রন্টের লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন কূটনীতিকরা। পরে তাদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিপর্যায়েও আলোচনা হয়। বৈঠকের পর গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

সূত্র জানায়, ব্রিফিংয়ের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাগত বক্তব্য দেন এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের পরিচয় করিয়ে দেন। এর পর কূটনীতিকদের কাছে মূলত ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা ও ১১ লক্ষ্য তুলে ধরেন ড. কামাল হোসেন। এ সময় কূটনীতিকরা বেশ কিছু বিষয় জানতে চান। কূটনীতিকদের সব প্রশ্নের উত্তর দেন ড. কামাল হোসেন।

কূটনীতিকরা জানতে চান, বিএনপি বলছে তাদের দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে যাবে না, সে ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান কী? এমন প্রশ্নে ড. কামাল হোসেন বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যেতে চায়। তবে বর্তমানে দেশে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে।

কূটনীতিকদের প্রশ্ন ছিল জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হলে সরকারের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয়, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবং ঐক্যফ্রন্টে স্থান না পাওয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা নিয়েও ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান জানতে চান কূটনীতিকরা। এর ব্যাখ্যায় ড. কামাল বলেন, এরই মধ্যে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্য উঠে এসেছে। আমরা স্পষ্ট বলেছি মুক্তি সংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের এ ঐক্য। ঐক্যফ্রন্টের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে জামায়াতের এখন নিবন্ধনই নেই। এর বাইরে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

এক কূটনীতিক জানতে চান ঐক্যফ্রন্টের দাবিগুলো বাংলাদেশের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়। সে ক্ষেত্রে তারা কী করবেন জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, সংবিধান দেশের জনগণের জন্য। তারাই এর মালিক। তাদের প্রয়োজনে এটি পরিবর্তন করা যায়। এ সময়ে তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য আন্দোলন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এবার ক্ষমতাসীনরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে এই সংবিধান সংশোধন করেছে। কিন্তু দেশের কল্যাণে এর পরিবর্তন সম্ভব।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। কিন্তু সেটিকে বাদ দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে এবং জাতীয় সংসদকে বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এ সময়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, এই কমিশনের অধীনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব নয়। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন ড. কামাল।

সারাদেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নামে গায়েবি মামলা দেওয়া হচ্ছে তা উল্লেখ করে ড. কামাল বলেন, যেখানে কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সেখানে হাজার হাজার মামলা দেওয়া হচ্ছে। এসব মামলার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনী আয়োজন ব্যাহত করা হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সভা-সমাবেশ করার প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তুলে ধরে ঐক্যফ্রন্ট নেতা বলেন, বিগত দুই বছর ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করলেও বিরোধী দলকে অনুমতি দেওয়া হয় না। এটি দিয়ে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা তো নির্বাচনে যেতে চাই। নির্বাচনে যাওয়ার জন্যই দাবিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনে যাব বলেই তো নির্বাচনের পরিবেশটা চাই। নির্বাচনে না গেলে তো পরিবেশ চাওয়ার দরকার নেই।

ঐক্যফ্রন্টের নেতা হিসেবে শুধু আপনি কেন আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এমন প্রশ্নে কামাল হোসেন বলেন, কে কী বলল এটি আমার কাছে বড় বিষয় নয়; আমার কাছে দেশ বড়।

বৈঠকে কূটনীতিকরা জানতে চান, নবগঠিত এই জাতীয় ঐক্যের মূল নেতা কে? ড. কামাল বলেন, এখানে কোনো একক নেতৃত্ব নেই। যৌথ নেতৃত্বেই জোট পরিচালিত হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, কাতার, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, চীন, তুরস্ক, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ভিয়েতনাম, নরওয়ে, মরক্কো, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্সসহ ৩০টিরও অধিক দেশের কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।

কূটনীতিক ব্রিফিংয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে আরও ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জেএসডির (রব) আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠক নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এখনই বলার সময় হয়নি। বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা আ স ম আবদুর রব বলেন, আজকে আমরা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। অত্যন্ত সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। সিলেটে জনসভার বিষয়ে তিনি বলেন, ২৩ অক্টোবর সিলেটে জনসভা ছিল তার অনুমতি দেয়নি সরকার। আমরা আশা করব, অন্তত ২৪ তারিখ অনুমতি দেওয়া হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আজকে কূটনীতিকদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা ও ১১ লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করেছি। এসব দাবি তাদের কাছে তুলে ধরেছি। কূটনীতিকরা এসব দাবির বিষয়ে কী বলেছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ড. মঈন খান বলেন, তারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা কী ভাবছে, সেটি তারাই বলতে পারেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে