প্রতিমা বিসর্জন

নাইয়র শেষে স্বামীর বাড়ি দেবী দুর্গা

  রেজাউল রেজা

২০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজয়া দশমীতে ভক্ত-অনুরাগীদের কাঁদিয়ে বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি কৈলাস ফিরলেন দুর্গতিনাশিনী দশভুজা দুর্গা। সব রীতিনীতি শেষে বিজয়ার শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গতকাল শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত হয় এ উৎসব। প্রতিবছরের মতো এবারও ষষ্ঠীর দিনে ঢাকঢোল, কাঁসর আর উলুধ্বনির মাঝে কন্যারূপে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসেন দেবী। সঙ্গে আনেন তার দুই দুহিতা বিদ্যার দেবী সরস্বতী, ধনের দেবী লক্ষ্মী, দুই পুত্র সিদ্ধিদাতা গণেশ আর দেব সেনাপতি কার্তিক। ষষ্ঠী

থেকে বিজয়া দশমীÑ ভক্ত-অনুরাগীর প্রার্থনা, আরাধনা, অঞ্জলি গ্রহণ

করে নাইওর শেষে বাবার বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে ফিরে গেলেন অসুরদামিনী দুর্গা। বিদায় নিলেও সন্তানের কল্যাণে দেবী আশীর্বাদ রেখে গেছেন এ মর্তলোকে।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রঞ্জিত চক্রবর্তী বলেন, ‘দেবী এবার মর্তলোকে আসেন ঘোটকে (ঘোড়ায়) চড়ে। এতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগশোক হানাহানি মারামারি বাড়বে। অন্যদিকে কৈলাসে ফিরে গেছেন দোলায় (পালকি) চড়ে। যার ফলে জগতে মড়কব্যাধি এবং প্রাণহানির মতো ঘটনা বাড়বে।’ তবে ফল যা-ই হোক না কেন; মা সর্বদা মঙ্গলময়ী, আনন্দময়ী বলে জানান রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী ধ্রুবেশানন্দ। তিনি বললেন, ‘মা দুর্গা জগতের কল্যাণ করেন। তিনি সন্তানের কল্যাণই করবেন।’

মা বলে কথা, যিনি সর্বদাই কল্যাণময়ী। তাই মায়ের বিদায়লগ্নেও আশীর্বাদ কামনায় ব্যস্ত ছিলেন সন্তানরা। সকাল থেকেই পূজাম-পগুলোতে দশমীবিহিত পূজা আর দর্পণ বিসর্জনের পর মঙ্গল কামনা করে চলে সিঁদুর খেলা। বিদায়ের সুরের পাশে ছিল আনন্দের রেশও। ‘আসছে বছর আবার হবে’Ñ এ প্রত্যাশায় আনন্দের রেশটুকু থেকে যাবে আগামীর জন্য।

বিকাল থেকে ম-পগুলো থেকে বের করা হয় শোভাযাত্রা। ঢাকের তালে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বিসর্জনে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত জানান, এবার রাজধানীর পুরান ঢাকাসহ দক্ষিণ অঞ্চলের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা নদীতে সদরঘাটের ওয়াইজঘাট এবং গুলশান-বনানীসহ উত্তর অঞ্চলের জন্য তুরাগ নদীতে আশুলিয়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট নির্ধারণ করা হয়। প্রতিমা নিয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের হয় বিকাল ৩টায়। এর পর ৫টায় ওয়াইজঘাটে বিসর্জন সম্পন্ন হয়।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহা জানান, গতকাল দুপুর ২টায় গুলশান-বনানী পূজাম-প প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সমাজের বিশিষ্টজনরা। এর পর বিকালে আশুলিয়ায় প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়। শোভাযাত্রায় ভক্ত ও দর্শনার্থীর ছিল উপচেপড়া ভিড়। ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু কুমার দাস বলেন, ‘দুর্গাপূজা এখন আর পূজার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রূপান্তরিত হয়েছে একটি সর্বজনীন উৎসবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও বিভেদ ভুলে সবাই এতে শামিল হয়। সব রীতিনীতি মেনেই শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে এবারের দুর্গোৎসব।’

পতেঙ্গা সৈকতে দেবীর বিসর্জন : আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিতে গতকাল পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। নগরীর ২৬০টি ম-পের বেশিরভাগ প্রতিমাই বিসর্জন হয় পতেঙ্গা সৈকতে। এবার অবশ্য পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি পূজাম-প থেকে পতেঙ্গা সৈকত পর্যন্ত সবখানে রাজনীতিকদের বেশি দেখা গেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে দেবীর বিজর্সন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বিকালে সৈকতের কাছে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে এ কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন। জানা যায়, নগরীর বাইরে রাউজান, হাটহাজারী থেকেও দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য পতেঙ্গা সৈকতে আনা হয়। সৈকতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করেন। সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা সফিকুল মন্নান সিদ্দিকী আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিজয়া দশমীর দিন সব পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। এ জন্য আগের রাতেই তারা নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।’

কক্সবাজার সৈকতে লাখো মানুষের ঢল : বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে দেশের বৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গতকাল বিকালে ১০০টি প্রতিমা বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় লাখো মানুষের ঢল নামে। সৈকতের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সৈকতের বালিয়াড়ি পরিণত হয় মিলনমেলায়। ছিলেন পূজারি, ভক্ত, দর্শনার্থী, পর্যটকসহ সব সম্প্রদায়ের লোক।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে