চোখের দেখায় মেলে গাড়ির ফিটনেস সনদ

সড়কে সেই বিশৃঙ্খলাই

  তাওহীদুল ইসলাম ও হাবিব রহমান

২২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ কারণে ট্রাফিক আইনে মামলা ও জরিমানার পরিমাণ দেড়গুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব কম হয়েছে। মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট পরার প্রবণতা বাড়াসহ সামান্য কিছুক্ষেত্রে ভালো ফলও পাওয়া গেছে। তবে সার্বিক অবস্থা বিচারে ঢাকার সড়কগুলোয় প্রায় আগের মতোই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজমান।

এদিকে রাজধানীর বাস-মিনিবাসের ৯০ শতাংশই লক্কড়-ঝক্কড়। তবে গাড়ির ফিটনেস নিতে চলে জালিয়াতি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গাড়ি না দেখে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়। এ কারণে ৩৫ লাখ গাড়ির মধ্যে ৩০ লাখেরই ফিটনেস সনদ আছে।

সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরার কারণ হিসেবে চালক ও যাত্রীদের অসচেতনতা এবং আইন না মানার প্রবণতাকে মোটা দাগে দায়ী করছে ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া শৃঙ্খলার কাজে যুক্ত অন্য প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতাও বড় কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফের ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণাসহ নতুন কিছু উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। মূলত এ ঘটনার জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয় সরকার। এর পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ ও মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কার্যক্রম পালনের মধ্য দিয়ে সড়কে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে নামে পুলিশ। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারও চালায়।

ডিএমপির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের মুখে ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণার আগে গত জুন ও জুলাই মাসে রাজধানীতে ট্রাফিক আইনে মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭০১, যা ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণার পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩১২-এ। একইভাবে জুন ও জুলাই মাসে জরিমানার পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৭৭ টাকা, যা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৪১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৫১ টাকা। এই পরিসংখ্যান আগের দুই মাসের দেড়গুণের বেশি।

পুলিশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তারা বলছেন, সড়কে পুলিশ যতই কঠোর হোক না কেন, মানুষ সচেতন না হলে সব উদ্যোগই বিফলে যেতে পারে।

তবে চালক ও যাত্রীরা বলছেন, পুলিশ আগের চেয়ে সক্রিয় হয়েছে এটা ঠিক। তার পরও পুলিশের নৈতিকতা শতভাগ কাজ না করলে আইন প্রয়োগের সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

ঢাকার রাজপথে দরজা খোলা রেখেই চলছে বিভিন্ন রুটের বাস। এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলছে। গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হয় যত্রতত্র বাসে যাত্রী তোলা ও নামানো। হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে তেল না দেওয়ায় বিষয়টি প্রায় সবাইকে মানতে দেখা গেছে সড়কে। এমনকি সহযাত্রীর মাথায়ও শোভা পাচ্ছে হেলমেট।

এ বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল করিম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে বেশকিছু ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। তবে ট্রাফিক সমস্যা যেমন এক দিনের নয়, তেমনি রাতারাতি তা দূর করাও যাবে না। ভবিষ্যতে আরও নানা উদ্যোগ নিয়ে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুসারে, আগের বছরের চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ শতাংশ প্রাণহানি বেড়েছে। আবার ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মোট দুর্ঘটনা ১ দশমিক ৬ শতাংশ, নিহত ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, আহত ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই নামে একটি সংগঠনের তথ্যানুসারে ২০১৭ সালে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ৫ হাজার ৬৪৫ জনের। সংস্থাটির হিসাবে ২০১৬ সালের চেয়ে দেড় হাজার মৃত্যু বেড়েছে ২০১৭ সালে।

চোখের দেখায় মেলে সনদ : রাজধানীতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ৯০ শতাংশই লক্কড়-ঝক্কড়। জালিয়াতির মাধ্যমে বেশিরভাগ যানবাহনের ফিটনেস নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে গাড়ি না দেখে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়। এ কারণে ৩৫ লাখ গাড়ির মধ্যে ৩০ লাখেরই ফিটনেস সনদ আছে। ফিটনেস নেই মাত্র ৫ লাখ ২ হাজার ১৩টি গাড়ির। এ তথ্য কেবল ফিটনেসের টাকা জমা না পড়ার হিসাবে। অথচ ফিটনেস দেওয়ার আগে ৬০ ধরনের কারিগরি ও যানের বাহ্যিক দিক বিবেচনা করতে হয়। এসব পরখের চিন্তাই করেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, গাড়ির ফিটনেস যাচাই করা হচ্ছে যথাযথভাবে। সংস্থার মোটরযান পরিদর্শকদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম পেলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি নির্দেশনা কখনই মানেন না পরিবহনকর্মীরা। ফিটনেস ও রুট পারমিটবিহীন গাড়ির তালিকা করে দফায় দফায় সময় দেওয়া হয় নবায়নের জন্য। বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে কাগজ হালনাগাদ না করলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু এ ধরনের আলটিমেটামকে পরিবহন মালিকরা পাত্তা দেন না। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ১০ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ বার মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার ৬১৫, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখে। কেবল ঢাকা শহরেই ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ১৬ হাজার। মাঝে কয়েকবার ফিটনেসবিহীন গাড়ির জরিমানাও মওকুফ করে সরকার। তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি।

জানা গেছে, গাড়ির ফিটনেসে অনিয়ম ঠেকাতে যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৯৮ সালে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি যন্ত্র বসানো হয়। এডিবির অর্থায়নে স্থাপিত এসব যন্ত্র ব্যবহারের আগেই অকেজো হয়ে পড়ে। কখনো ফিটনেস পরীক্ষা করা যায়নি। পরিত্যক্ত হয়ে পড়া ওই ৫টি ভিআইসির একটি মেরামত শেষে চালু করা হয় মিরপুরে। একইভাবে আরও ৪টি ভিআইসি ঢাকার ইকুরিয়া, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে প্রতিস্থাপনের জন্য কোরিয়ান সংস্থা কোইকার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিআরটিএ। এ অবস্থায়ই ফিটনেস কার্যক্রম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ডিপিএম (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) অথবা এলটিএম (লিমিটেড প্রকিউরমেন্ট মেথড) পদ্ধতিতে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার আভাস মিলছে।

আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস : সম্প্রতি দেশব্যাপী আন্দোলন এবং নতুন করে আইন প্রণয়নের পরও সড়কে মৃত্যুঝুঁকি রয়ে গেছে আগের মতোই। আগের মতোই চলছে নৈরাজ্য। বন্ধ হয়নি অবৈধ যান চলাচল। আইন মানছেন না চালক, যাত্রী, পথচারী কেউ। সড়কে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যেই আজ সোমবার পালিত হবে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য আইন মেনে চলব, নিরাপদ সড়ক গড়ব।

গত বছর মন্ত্রিসভা ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে আজ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে। সকালে সংসদ ভবন এলাকায় র্যালি ও আলোচনাসভার আয়োজন করেছে বিআরটিএ।

ছাত্র আন্দোলনের পর সড়কে আইন মানতে কড়াকড়ি করেছিল পুলিশ। প্রথমে ১০ দিনের ট্রাফিক সপ্তাহের পর ৫ সেপ্টম্বর থেকে ট্রাফিক সচেনতা মাস পালন করে। সচেনতা মাসে ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনায় সেপ্টেম্বরে মোট ১ লাখ ৭২ হাজার ৬০০টি মামলা করা হয়। এর পর সড়কে আইন প্রয়োগে আবারও দেখা দিয়েছে পুরনো শিথিলতা। ফিরে এসেছে আইন অমান্যের অভ্যাস।

পুলিশের হিসাবে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। ২০১৪ সালে সরকারের কর্মপরিকল্পনায় দুর্ঘটনার জন্য ৯টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা অর্ধেক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসাব বলছে, গত ৩ বছরে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। যাত্রী কল্যাণের হিসাবে ২০১৭ সালে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেড়েছে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটউটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনীতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৪৭ শতাংশই ছিলেন পথচারী। আগের বছরে নিহতদের ৪০ শতাংশ ছিলেন পথচারী। বুয়েটের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষতি হয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে