শেখ হাসিনাকেও এখানে আনা হোক

নাইকো দুর্নীতি মামলায় শুনানিকালে খালেদা জিয়া

  আদালত প্রতিবেদক

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৩৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নাইকো দুর্নীতি মামলার আসামি। তাকেও আদালতে হাজির করা হোক। গতকাল বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারের আদালতে মামলাটির শুনানিকালে আদালতকে উদ্দেশ করে এ কথা বলেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে গাড়িতে করে ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সরাসরি কারাগারের ভেতরের আদালতে একটি হুইলচেয়ারে করে হাজির করা হয়। তাকে আদালতের এজলাস কক্ষে হাজির করার পরও তিনি হুইলচেয়ারেই বসে ছিলেন। ওই সময় তিনি হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরে ছিলেন।

বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার ৯ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মাহমুদুল কবীর এজলাসে উঠলে দুদকের প্রসিকিউটর মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, আগে আপনি (বিচারক) বকশিবাজারের আদালতে বসতেন; এখন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এখানে আনা হয়েছে। এ মামলায় উচ্চ আদালতের কোনো স্থগিতাদেশ নেই। তাই আমরা চার্জ শুনানি শুরু করতে পারি।

এর পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, মামলায় মওদুদ আহমদের পক্ষে চার্জ শুনানি চলমান আছে। তিনি হাইকোর্টে রিভিশন করেছেন। আমাদের চার্জ শুনানি মওদুদ আমাদের শুনানি শেষ হওয়ার পর হবে। আজ মুলতবি চেয়েছি।

এর পর মওদুদ আহমদ বলেন, আমার রিভিশন মামলা এখনো বিচারাধীন। কোনো আদেশ পাইনি। তাই আমিও মুলতবি চাচ্ছি।

জবাবে প্রসিকিউটর মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, ২০০৮ সালের ৫ মে থেকে এ মামলায় চার্জ শুনানি শুরু হয়। আজও শেষ হয়নি। মওদুদ আহমদ সাহেবের জন্যই শুনানি ঝুলে আছে। এ মামলায় এ পর্যন্ত এহাজার, চার্জশিট ও প্রসিডিংসহ অনেক বিষয়ই তারা চ্যালেঞ্জ করেছেন; কিন্তু কোনো আদেশ আনতে পারেননি। তাই এখন বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

এর পর মওদুদ আহমদ আদালতের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, এখানে তো মামলার বিচারকাজ চলার মতো পরিবেশ নেই। বসার জায়গা নেই। ওয়াশরুম নেই। আমি যে লিগ্যাল ওপিনিয়ন দিয়েছিলাম তা-ও আমাকে দেওয়া হয়নি। তাই সময় চাচ্ছি।

এর পর বিচারক বলেন, যেহেতু উচ্চ আদাললতের কোনো স্থগিতাদেশ নেই, তাই সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করা হলো। চার্জ শুনানি শুরু করুন।

এর পর মওদুদ আহমদ বলেন, বেশি সময় থাকতে পারব না। মামলা রেখে এসেছি। জবাবে বিচারক বলেন, আপনি (মওদুদ) যত দেরি করবেন আপনার নেত্রীকেও (খালেদা জিয়া) তত সময় বসে থাকতে হবে। আপনি বিলম্ব করলে তার কষ্ট হবে। তাই আপনি যত তাড়াতাড়ি শেষ করবেন, তিনি তত তাড়াতাড়ি যেতে পারবেন।

এর পর মওদুদ আহমদ বলেন, জানলাম, আজই (বৃহস্পতিবার) তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে এখানে আনা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে চিকিৎসা তাকে দেওয়া হয়নি।

এর পর তিনি চার্জ শুনানি শুরু করেন। যেখানে তিনি মামলার এজাহার দেখে দেখে পড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে বলেন, মামলার ঘটনা শুরু ২০০৬ সাল থেকে। তাই আমরা শুধু বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। আমি যে মতামত দিয়েছি, তা আমাকে দেওয়া হয়নি। সেখানে আমি ছাড়াও ৮ জন স্বাক্ষর করেছেন। অথচ আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমাকে ডকুমেন্ট না দিলে কীভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করব।

এ সময় বিচারক বলেন, আপনি বোধহয় জানেন, চার্জ শুনানির সময় আসামিপক্ষের কোনো ডকুমেন্ট নিয়ে মামলা থেকে কাউকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই।

তখন মওদুদ আহমদ বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১ (এ) ধারাটি আসামির জন্যই করা হয়েছে। আপনি যদি সন্তুষ্ট হন, আমি নির্দোষ তবে কেন হব না। এর মধ্যে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আদালতে উপস্থিত হন। তাকে আদালত কক্ষে একটি চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়।

মওদুদ আহমদ এজাহার থেকে পড়া শুরু করেন, সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ এলে বিচারক বলেন, আপনি (মওদুদ আহমদ) এর আগে দুই দিন চার্জ শুনানি করেছেন। সেখানে এজাহার পড়ে চার্জশিটে গিয়েছেন। আজ আবার এজাহার পড়ছেন। আর আপনার বিষয়ে যেখানে অভিযোগ সেখানে পড়লেই পারেন।

ওই সময় খালেদা জিয়া বিচারকের উদ্দেশে বলেন, আপনি (বিচারক) কেন তাকে বাধা দিচ্ছেন। ওনাকে বলতে দিন। তিনিও (শেখ হাসিনা) তো এ মামলার আসামি।

তখন বিচারক বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) এ মামলার কেউ নন। তাই বলতে পারবেন না। ওনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে সেটা বলবেন।

উত্তরে খালেদা জিয়া বলেন, উনিও (শেখ হাসিনা) এ মামলার আসামি। তাকেও আদালতে আনতে হবে। আমরা তো তার করা চুক্তির শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। তাই তাকে আদালতে আনতে হবে। আদালতে এসে তাকে জবাব দিতে হবে। আপনারা একজনকে সেভ করে আরেক জনকে বলি দেবেন, তা হবে না।

এর পর মওদুদ আহমদ বলেন, আসলে উনি (খালেদা জিয়া) বলতে চেয়েছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সরকারই এ চুক্তি অনুমোদন করেছিলেন। আমরা শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। এ নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একটি মামলা হয়েছিল। তাই এ নিয়ে তার একার কেন বিচার হবে।

এর পর বিচারক খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, আপনার আইনজীবী বলার সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনে তখন আপনিও বলতে পারবেন।

এর পর মওদুদ আহমদ ফের এজাহার পড়া শুরু করে ১২টা ৫৫ মিনিটে তা শেষ করে বলেন, আজ এ পর্যন্ত থাক, ম্যাডামও অসুস্থ। তখন বিচারক বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম, আপনি যত দেরি করবেন, আপনার ম্যাডামের তত কষ্ট হবে। এর পর মওদুদ আহমদ বলেন, আমার বয়স ৮১ বছর। আপনি কি আমাকে জোর করছেন, যে আজই শেষ করতে হবে।

এ সময় খালেদা জিয়া বলেন, উনি তো করেছেন, আর আমিও অসুস্থ, অনেক সময় বসে থাকতে পারব না।

তখন বিচারক বলেন, উনি (মওদুদ আহমদ) ঘুরেফিরে একই স্থানে চলে আসছেন। এ সময় প্রসিকিউটর কাজল বলেন, এভাবে চলতে পারে না। যদি উনি না করেন, তবে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুরু করুন।

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন বলেন, উনি (মওদুদ) উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলা থাকা অবস্থায়ও আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে চার্জ শুনানি করেছেন। আর সামনে আমাদের অসুস্থ নেত্রী বসে আছেন, এ অবস্থায় আমাদের কথা বলার সাহস-শান্তিও হারিয়ে যায়। তাই আজকের মতো শেষ করতে পারেন। এ ছাড়া এ সময় আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমাদের সিনিয়র আইনজীবী রেজ্জাক খানও নেই। তাই আমাদের সময় দিতে হবে।

তখন বিচারক বলেন, ঠিক আছে আগামী রবিবার পর্যন্ত সময় দিলাম। ওই সময় মওদুদ আহমদ বলেন, ওইদিন আমার একটি মামলা আছে। ওই মামলায়ও আমি আসামি। তাই পিছিয়ে বৃহস্পতিবার দিন।

ওই সময় দুদকের প্রসিকিউটর কাজল আপত্তি দিলে বিচারক আগামী বুধবার ১৪ নভেম্বর চার্জ শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেন এবং ওইদিন মওদুদ আহমদকে তার শুনানি শেষে করতে হবে বলেও জানান।

শুনানিকালে মামলার অপর আসামিদের মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া (সিলভার সেলিম), সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সিএম ইউছুফ হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।

জামিনে থাকা অপর আসামি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আসামি নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ, তখনকার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক পলাতক রয়েছেন।

নাইকো মামলায় ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর আদালতে খালেদা জিয়া আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।

২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটির তদন্তের পর ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে