sara

মির্জা আব্বাসসহ বিএনপির ৬ নেতা হুকুমদাতা

আসামি ৪৮৮ নেতাকর্মী

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০১:২১ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গত বুধবার সংঘর্ষের ঘটনায় পল্টন থানায় ৩টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশে পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আব্বাসসহ দলটির ৬ নেতাকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। আর মোট ৪৮৮ জনকে আসামি করা হয়েছে নাম উল্লেখ করে। তারা সবাই বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। মামলায় গতকাল রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৬৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৮ জনের প্রত্যেকের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত এবং ২৭ জনের রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাদের ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ৩ কার্যদিবস জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম সারাফুজ্জামান আনছারী শুনানি শেষে এসব আদেশ দেন। এ ছাড়া ৩ জনকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে হুকুমের আসামিসহ অন্যান্য আসামি ধরতে পুলিশের পাশাপাশি তৎপর রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশও। হুকুমের আসামিরা হচ্ছেনÑ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, জাতীয় মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর আকতারুজ্জামান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কফিল উদ্দিন, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির সভাপতি নবীউল্লাহ নবী। পুলিশের অভিযোগ, তাদের মদদে ও নির্দেশে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে সরকারি কাজে বাধা, জানমালের ক্ষতি, ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি পুড়িয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়।

পুলিশের ওপর হামলা এবং গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় পল্টন থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নম্বর যথাক্রমে ২১, ২২ ও ২৩। ২১ নম্বর মামলায় এজাহার নামীয় আসামি ১৯২ জন; গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন। ২২ নম্বর মামলায় আসামি ১৫৯ জন; গ্রেপ্তার ২৩ জন। ২৩ নম্বর মামলায় ১৩৭ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৬ জন।

মামলা তিনটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুজন কুমার তালুকদার, শেখ মো. জসিম উদ্দিন ও কাজী আশরাফুল হক গতকাল ৩৮ আসামির প্রত্যেকের ১০ দিন করে এবং ২৭ আসামির প্রত্যেকের ৭ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন।

পল্টন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, রাস্তা অবরোধ, পুলিশকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও তার স্ত্রী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসসহ দলটির অন্যান্য শীর্ষনেতাকে আসামি করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুসহ এ পর্যন্ত ৬৮ জনকে এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগকারীদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা সবাই বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। পুলিশকে উত্তেজিত করে একটি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ ভÐুুল এবং অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করতেই পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্তকরণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশের করা তিনটি মামলায় প্রায় একই বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোতে বলা হয়েছেÑ মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভী, আফরোজা আব্বাস, নবী উল্লাহ নবী, আকতারুজ্জামান ও কফিল উদ্দিনসহ দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত অন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশে ও মদদে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে এ হামলা চালানো হয়েছে।

মামলায় আসামি হওয়া বিএনপির অন্তত ১০ নেতা রয়েছেন, যারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন। তারা হলেনÑ মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভী, আফরোজা আব্বাস, নবী উল্লাহ নবী, মেজর (অব) আখতারুজ্জামান, সামসুউদ্দিন দিদার, নিপুণ রায় চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, সেলিম ভ‚ঁইয়া, হাজী লিটন, কাজী আবুল বাশার ও আব্দুল হালিম।

গতকাল আদালতে আসামিপক্ষে রিমান্ড বাতিলপূর্বক জামিনের আবেদন করেন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। শুনানিতে তিনি বলেন, সরকারের উসকানিতেই এ ঘটনা ঘটেছে। এ সরকারই শেষ সরকার নয়। আরও সরকার আসবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আসামিদের জামিন দিন। দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আইনজহীবী, সেনাবাহিনী এর দায়ভার নেবে না। নিতে হবে সরকারকে। তাই জামিন দিয়ে আজ নজির স্থাপন করুন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর সালমা হাই টুনি প্রমুখ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন।

রিমান্ডকৃত আসামিদের মধ্যে রয়েছেনÑ সাবেক ছাত্রদল নেতা মনোজ সরকার, নেত্রকোনা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খালিদ সাইফুল্লাহ, ছাত্রদল নেতা ফাহিম হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা মশিউর রহমান, ছাত্রদল নেতা উৎপল সরকার, কেন্দ্রীয় বিএনপির কমিটি প্রার্থী সুফিয়ান, জাকির হোসেন, হানিফ উদ্দিন ওরফে রানা, ঢাবির মহসিন হল শাখা ছাত্রদল নেতা মাহবুব মিয়া, আনিসুর রহমান, ছাত্রদলের সহস্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. আতিকুর রহমান তালুকদার, মাইনুল হাসান মোহন, আনোয়ারুল হক ও মোহাম্মদ সুরুজ মÐলসহ ৩৮ জন।

জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ হওয়া আসামিরা হলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির শ্রম সরকার বিষয়ক সম্পাদক আনিছুজ্জামান খান বাবু, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. নিজাম উদ্দিন, ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার হারুন অর রশিদ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাহারুল আলম বাহার, বিএনপির সক্রিয় কর্মী আলমগীর হোসেন, সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি হোসেন আহম্মদ, বিএনপির সক্রিয় কর্মী তারিকুল ইসলাম, বালিয়াকান্দার যুবদলের সহ-সভাপতি আরিফুজ্জামান, খায়রুল কবির কাজল, বিএনপির সক্রিয় কর্মী মুসা আহম্মেদ, আবু বক্কর সিদ্দিক, এসএম নাজমুল হোসেন, মাসুদ রানা, কেএম তারিকুল ইসলাম আরিফ, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে শামীম, রকিব আল মান্নান (৩০), সাইফুল আলম গজনবী চয়ন (৩২), ছাত্রদল নেতা মো. মোখসেদ আলম জুয়েল (৩০), নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদল সভাপতি ফরিদ হোসেন বাবু (৩৩), জামায়াতের রোকন জাহিদুল ইসলাম মামুন (৩১), ছাত্রদল নেতা মো. রুবেল বেপারী (৩২), নাগরপুর থানা যুবদলের যুগ্ম আহŸায়ক ইকবাল কবির (৪১), ২৭নং ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান লিপু (৪০), দারুসসালাম থানার ৯ নং ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন স্বপন (৩৭), চাঁদপুর জেলার দক্ষিণ মতলব থানার কাদেরগাঁও ইউনিয়নের বিএনপির যুগ্ম আহŸায়ক মো. জিলানী তালুকদার (৪২), কাদেরগাঁও ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহŸায়ক মো. লিটন মজুমদার (৪০) ও বিএনপির সদস্য মো. সোহাগ (৩৫)।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত করা হয়। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জারিকৃত নির্বাচন আচরণবিধিতে ব্যান্ড পার্টি, ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শোডাউনের নিষেধাজ্ঞা সত্তে¡ও বিএনপি নেত্রী আফরোজা আব্বাসের নেতৃত্বে একটি মিছিল ফকিরাপুলের দিক হতে ব্যান্ড পার্টি, ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শোডাউন করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসে। এরপর নবী উল্লাহ নবী ও কফিল উদ্দিনের নেতৃত্বে অপর দুইটি মিছিল শোডাউন দিয়ে একই দিকে আসতে থাকে এবং এবং সর্বশেষ মির্জা আব্বাস ৮ থেকে ১০ হাজার জনের একটি মিছিল নিয়ে কার্যালয়ে আসেন। তারা নয়াপলন্টস্থ ভিআইপি রোড বন্ধ করে মিছিল ও শোডাউন করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ও জন দুর্ভোগ সৃষ্টি না করার জন্য তাদের রাস্তার এক লেন ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে তারা ক্ষিপ্ত হয়। তাদের নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের বিষয়টি বিএনপি অফিসে অবস্থানরত রুহুল কবীর রিজভীসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে জনানো হয়। অফিসের মাইকের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার বিষয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ঘোষণা দিতে অনুরোধ করা হয়। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে নয়াপল্টনস্থ ভিআইপি রোডে হকস বেনামীয় গাড়ির শোরুমের উত্তর পাশে রাস্তায় আসামিরা বিএনপির পার্টি অফিস থেকে লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তায় দাঙ্গা করে পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তারা কয়েকটি ককটেলও নিক্ষেপ করে। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানসহ দুটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এতে পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তা, দুজন আনসার সদস্যসহ ২৩ পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই ঘটনায় গত বুধবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে পল্টন থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে