sara

পেশাজীবীরা ভোটে

বড় দলগুলোর মনোনয়ন দৌড়ে সাবেক আমলারা

  ইউসুফ আরেফিন

১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন অথচ জেল-জুলুম-হুলিয়ার শিকার হননি, এমন রাজনীতিক বিরল। দলের বাইরে তো বটেই, ভেতরেও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই একজন রাজনীতিক নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হয়ে থাকেন। তবে এ দেশে জাতীয় নির্বাচন এলেই দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই বড় দলগুলোর টিকিটে নির্বাচনে অবতীর্ণ হন এবং আমলা থেকে যথারীতি রাজনীতিবিদে পরিণত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। বরাবরের মতো এবারের নির্বাচনেও অনেক সাবেক আমলাই রাজনীতিবিদের খাতায় নাম লেখাতে চাইছেন। তাদের মধ্যে সচিবালয়ের সাবেক শীর্ষ কর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পুলিশপ্রধান, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, কূটনীতিক থেকে শুরু করে অনেক সাবেক কর্মকর্তাই রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট দল থেকে সবুজ সংকেত প্রাপ্তিসাপেক্ষে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেছেন। কেউ কেউ এতটাই নির্বাচনমুখী যে, দলীয় মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতেও পিছপা হবেন না।

দাপ্তরিক অভিজ্ঞতা নিয়ে সাবেক আমলাদের রাজনীতির মাঠে এই দৌড় নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। তবে রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, কখনো রাজনীতি না করে নির্বাচন এলে হুট করেই প্রার্থী হলেও এবং দলীয় ব্যানারের বদৌলতে জয়ের মুখ দেখলেও এতে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হয় না; বরং ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, যা পুরো রাজনীতির মাঠেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরাও চাই সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা যোগ্য ও মেধাবী তারা রাজনীতিতে আসুন, নির্বাচন করুন। তা হলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে। কিন্তু রাজনীতি না করেই হঠাৎ দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তি এবং নির্বাচিত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়। যদিও আমাদের দেশে এমনটিই দেখা যাচ্ছে। আমলারা দলে যোগদান করছেন, নির্বাচনী টিকিট কাটছেন, ভোটে পাস করে রাজনীতিবিদ বনে যাচ্ছেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, চাকরি থেকে অবসরের কমপক্ষে তিন বছর পর নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন সরকারি কর্মকর্তারা। দেশের রাজনীতিতে বড় দুই দল হিসেবে বিবেচিত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে অতীতে অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা নির্বাচন করে সফল হয়েছেন। জাতীয় পার্টিরও অনেক নেতা সাবেক আমলা। দলগুলোও তাদের গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ১৯৯১ সালে রাজনীতির মাঠে নামেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এমকে আনোয়ার, যুক্ত হন বিএনপির সঙ্গে। কুমিল্লার হোমনা আসন থেকে পাঁচবার সাংসদ নির্বাচিত এই ব্যক্তি বিএনপির শাসনামলে পূর্ণ মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

সাবেক সচিব মহীউদ্দিন খান আলমগীর ২০০৮ সালে চাঁদপুর-১ (কচুয়া) থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবারও তিনি মনোনয়ন দৌড়ে আছেন। সাবেক আমলা থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে সফলতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সিলেট-১ আসনের বর্তমান সাংসদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার দেশের জাতীয় বাজেট পেশ করার রেকর্ডটি তার ঝুলিতেই। দিনাজপুর-৪ আসনের সাংসদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও সাবেক কূটনীতিক।

তিনি এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়েছেন। রংপুর-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ এইচএন আশিকুর রহমান, সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ অর্থ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এ তিনজনই সাবেক আমলা। তারাও আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি থেকে এবার আরও যেসব আমলা প্রার্থী হতে পারেন, তাদের একটি সম্ভাব্য তালিকা তুলে ধরা হলো-

আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন (হবিগঞ্জ-৪)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন (চাঁদপুর-১)। অবশ্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরও এ আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। পুলিশের সাবেক আইজিপি ও সাবেক সচিব নূর মোহাম্মদ (কিশোরগঞ্জ-২)। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ছোট ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি একেএ মোমেন এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন (সিলেট-১)।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব ও বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন (ফরিদপুর-১)। এ আসনের বর্তমান সাংসদ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য এবং কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত (কুমিল্লা-৭)। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য কামরুল হাসান খান (টাঙ্গাইল-৩)। এ আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের আমানুর রহমান খান রানা। তিনি হত্যা মামলায় বর্তমানে কারাবন্দি। মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম (চাঁদপুর-৫)। মেজর জেনারেল (অব) মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া (কুমিল্লা-১)।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের ভাই সাবেক সচিব মো. রশিদুল আলম (কুষ্টিয়া-২)। এ আসনের বর্তমান সাংসদ মহাজোটের শরিক জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক এম শাহ্ নওয়াজ আলী (রংপুর-২)। সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুর রহমান (বরগুনা-১)। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন।

বিএনপি

সাবেক সচিব ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী (সিলেট-১)। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এসএম আবদুল হালিম (জামালপুর-২)। সাবেক আইজিপি এমএ কাইয়ুম (জামালপুর-১)। লে. কর্নেল (অব) আবদুল লতিফ (নওগাঁ-৫)। সাবেক সচিব হায়দার আলী (শেরপুর-২)। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) নাসিরউদ্দিন আহমেদ (ফেনী-৩)। সাবেক সচিব মুশফিকুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪)। সাবেক সচিব আবু হেনা (রাজশাহী-৪)। মেজর (অব) আবদুল্লাহ আল মামুন (সিরাজগঞ্জ-৫)। সাবেক সচিব খান মোহাম্মদ ইব্রাহীম হোসেন (সিরাজগঞ্জ-৬)। মেজর জেনারেল (অব) রুহুল আলম চৌধুরী (ঢাকা-১৭)। সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এএফএম সোলায়মান চৌধুরী (কুমিল্লা-৯)।

জাতীয় পার্টি

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের শাসনামলের প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (ফেনী-৩)। তিনি গত ১০ নভেম্বর আওয়ামী লীগ থেকেও একই আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এর পাঁচ দিন পর জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এনএম নিয়াজ উদ্দিন মিয়া (গাজীপুর-২) প্রমুখ।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে