একাদশ জাতীয় নির্বাচন : পার্থক্য গড়বেন নারী ভোটাররা

  হাসান আল জাভেদ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটার সংখ্যার দিক থেকে নারী-পুরুষ প্রায় সমান হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে নারীরা। ভোটগ্রহণের দিন পুরুষরা সাধারণত ছুটির আমেজে থাকলেও নারীদের নিস্তার নেই রান্না-বান্না, স্বামী-সন্তান-সংসার সামলানোসহ পরিবারের নৈমিত্তিক কাজ থেকে। তবু ভোটের দিন প্রথম প্রহরেই দেখা যায় ভোটকেন্দ্রগুলোয় নারীদের লম্বা
লাইন। ঘর সামলানোর পাশাপাশি নেতা নির্বাচনেও তারা অধিক সচেতন। নারীসমাজের সচেতনতা সময়ের বিচারে ক্রমেই বাড়ছে; বাড়ছে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা নারীর সংখ্যা।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটাররাই যে কোনো দলের বা প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে যেসব দল বা প্রার্থী অচলায়তন ভেঙে নারীদের উঠে আসার পথ করে দিতে সহায়ক হবেন; নারীরাও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সেসব প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন। তাই নির্বাচনী বৈতরণী উতরাতে নারীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুত হতে হবে প্রার্থীদের।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) তথ্যও বলছে, জয়-পরাজয়ে নারী ভোটার বড় নিয়ামক। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সময় সংস্থাটি যেসব এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছিল, সেসব এলাকায় ভোট প্রদানের গড় হার ছিল ৩০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে মোট ভোটদাতার ৩১ শতাংশই ছিল নারী, পুরুষের হার ছিল ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য হারের।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ এবং নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। অর্থাৎ পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার মাত্র ৯ লাখ কম।

নারীনেত্রীরা বলছেন, ভোটারের সংখ্যায় এবং ভোট প্রয়োগের বিচারে নারীসমাজ এতটা অগ্রগামী হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১০ শতাংশ নারী সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদে ৫০ নারী প্রতিনিধি রাখা হলেও উন্নয়ন কর্মকা-ে তাদের অংশগ্রহণ ও তৃণমূলে যোগাযোগের সুযোগ খুবই সীমিত।

বাংলাদেশ অ্যালায়েন্স ফর উইমেন লিডারশিপের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে সংসদে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের কথা। পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় পরিবর্তন এনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অন্তত ৩৩ শতাংশ করার কথা। এ ছাড়া যেসব আসনে দল হেরে যায়, শুধু সেসব আসনে নারীদের যেন মনোনয়ন দেওয়া না হয়। নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বলা হয়েছিল, কমিশনের ভেতরে পরিবর্তন এনে তাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও যেন কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকে নারীর। ইসিতে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের পূর্বশর্ত হিসেবে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশীদারত্ব রাখার বিষয়টি যেন নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নারী-পুরুষের সমঅধিকারসহ সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার অঙ্গীকার থাকতে হবে। দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীকে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন, হয়রানি শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এটা বন্ধ করতে হবে। আমরা চাই সমাজে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে। যারা যৌন নিপীড়ক তাদের বিচার হোক # মি টু-এর মাধ্যমে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের দাবিগুলো অনুধাবন করেছে। তারা ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে সামনের দিনগুলোয় এগুলো বাস্তবায়ন করবে বলেও মনে করছি।

নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে, এর নেপথ্যে নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। পুরুষের পাশাপাশি আজ নারীরাও বড় উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হচ্ছেন। নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসতে পারেন না প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে; ব্যাংক ঋণ ও সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন পেতেও তারা লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া নারীরা ঘরে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও পান না মজুরি, পান না স্বীকৃতি। চাকরি বা যে কোনো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রাপ্তির বেলায়ও তারা নিগৃহীত হচ্ছেন। গ্রাম পর্যায়ে ৮৪ শতাংশ এবং শহরে ৫৯ ভাগ নারী অবৈতনিক কাজ করে। তাদের এ কাজ অর্থনৈতিক মানদণ্ডে ধর্তব্য নয়।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার আদায় এখন সময়ের দাবি। এক সময় নীরবে যাতনা সয়ে যাওয়া নারী এখন ঘরে-বাইরে সর্বত্র নির্যাতন-হয়রানির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে; আইনি ঢাল ব্যবহার করছে; প্রচার চালাচ্ছে সমাজের সর্বত্র। যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলন, যা সাড়া ফেলেছে সর্বত্র। শিকল ভেঙে উঠে আসা নারীদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কর্মকা- হিসাব-নিকাশ করে সেরা প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা আমাদের সময়কে বলেন, ভোটের সময় নারীদের গুরুত্ব বাড়লেও ভোটের পর অনেকেই খবর রাখে না। কিন্তু এখন নারীরা অনেক সচেতন। যারা নারীর উন্নয়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে নারীরা তাদেরই ভোট দেবে।

নারীনেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, জয় পরাজয় নির্ধারণে নারী ভোটাররা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। তাই সবার আগে নারীকে সুষ্ঠুভাবে ভোটদানের অধিকার দিতে হবে। এর পর নির্বাচন শেষে নারী যাতে নিজের পায়ে স্বাধীনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেই নিশ্চয়তা যারা দেবে সেই দল বা প্রার্থীই হাসবে শেষ হাসি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে