বাংলাদেশ এখন ভোটের রঙ্গমঞ্চ

  আবুল মোমেন

১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ এখন নির্বাচনের রঙ্গমঞ্চ। প্রার্থী, মনোনয়ন, মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রার্থীদের আপিল নিষ্পত্তি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তকরণ, প্রতীক বরাদ্দ- সবই ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৮ দিন চলবে প্রচার। শব্দদূষণ যে মাত্রা ছাড়াবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শহর, বন্দর, লোকালয়, জনপদ, গঞ্জ-গাঁ সর্বত্র প্রার্থীদের পোস্টারে ছেয়ে যাবে। সত্যিই নির্বাচন রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক কৃত্য হলেও বাংলাদেশে এর রূপ ভিন্ন। আর নির্বাচনের আবহে একদিকে যদি থাকে টানটান উত্তেজনা, তো অন্যদিকে মনমাতানো উৎসবের আমেজ।

ভোটারদের কেউ আছেন নির্ভার, ফুরফুরে মেজাজে; কারো মনে শঙ্কা, উদ্বেগ। একদল মুখিয়ে আছেন ভোট দেওয়ার জন্যে; আরেক দলের কপালে ভাঁজ ভোট দেওয়া যাবে তো! বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে নির্বাচনী অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করছে।

কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিল বিরোধী দল বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম জমিয়ে তুলতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, ঠিক একই ভাবে নির্বাচন নিয়েও সরকারি দলের কৌশলের কাছে পরাস্ত হবে; প্রতিপক্ষকে সরকারি দল হেসেখেলেই হারিয়ে দেবে। ক্ষমতা তাদের হাতছাড়া হবে না। আর যাকে কিনা এতদিন নির্বাচনী লড়াইয়ের দ্বাদশ খেলোয়াড় ভাবতেও নারাজ ছিলেন ঝানু খেলোয়াড়েরা, সেই নিপাট ভদ্রলোক ড. কামাল হোসেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে। চমকই বটে, কারণ এটি অভাবনীয় ঘটনা। কিন্তু বাংলাদেশ তো সব সম্ভবের দেশ। ফলে কামাল হোসেনেরই হাত ধরে নেতিয়ে পড়া বিএনপি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তাদের সুরক্ষার বর্ম হিসেবে নিস্তেজ শরীরের টনিক হয়ে কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তৈরি হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর আড়ালে বিএনপি যেমন একটু হাঁপ ছাড়ার অবকাশ পেল, তেমনি নিষিদ্ধপ্রায় জামায়াতও অস্তিত্ব রক্ষার সুযোগ পেল।

আদতে এ নির্বাচন বিএনপির জন্য অস্তিত্ব রক্ষার উপলক্ষ। ফলে বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ ফসকে গেলে দলের নাভিশ্বাস উঠত; অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কা দেখা দিত। বিএনপির এই পুনরুজ্জীবন কামাল হোসেনের হস্তক্ষেপ বা অগ্রদৌত্য ছাড়া সম্ভব ছিল না। এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের দাগ মুছতে এবার মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এই সঞ্জীবনী সুধা কেবল বিএনপির প্রাণ ফেরায়নি, নির্বাচন কমিশনের চৈতন্যও ফিরিয়েছে। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, তাদের একটু নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে হচ্ছে। তাদের রিটার্নিং অফিসাররা প্রার্থিতার প্রাথমিক বাছাইয়ে নির্বিচারী হয়ে থাকলেও আপিল নিষ্পত্তিতে কমিশনকে অনেকটাই নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে হয়েছে।

এখন মনে হচ্ছে, নির্বাচন ২০১৮-এর গাড়ি ঠিকঠাকভাবে চলতে শুরু করেছে। এতদূর এগিয়ে এবং এতটা অর্জনের পর বিএনপির পক্ষেও আর এ নির্বাচন বর্জনের কথা ভাবা সহজ হবে না। সরকারের একটা বড় অর্জন হলো, তারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দুই জোটে যে দুটি বিতর্কিত দল পরিস্থিতির রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে, সেই আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টি আর বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এবার ক্ষীণতর হবে বলে মনে হয়। স্বৈরাচারের দল বা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে পরিচিত এ দুটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব ও শক্তি কমে এলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য শাপে বর হবে।

আজ থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। ভোটাররা এখন থেকে মূল্যবান মানুষ। প্রার্থীরা যেন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা দোরে-দোরে জনে-জনে ভোট ভিক্ষা করবেন। ভোটাররা কি আগের চেয়ে আরও বিচক্ষণ ও পরিণত হয়ে উঠেছেন? তার প্রমাণ মিলবে ৩০ তারিখের নির্বাচনের দিন।

একপক্ষ চাইছে তাদের উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ, আর তাই চাই বিজয়; অপর পক্ষ বলছে মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ের অংশ এ নির্বাচন, আর তাই চাই বিজয়। আওয়ামী লীগ চায় ২০২১ সালে ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে। আর বিএনপি চায় নির্বাচনে জয়লাভ করে বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে মুক্ত করে দলের পূর্ণ শক্তি ফিরিয়ে আনতে। অবশ্য শেষ কথা বলবেন ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন ভোটার। তাঁরা কী চাইছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এই বিপুল ভোটারের মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ হলো তরুণ ভোটার, যা মোট ভোটারের ২২ শতাংশ। আগামী ১৮ দিন অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত সময় পাচ্ছেন সব প্রার্থী এই বিপুল ভোটারের মন জয় করতে এবং মন বদলাতে। তারই কসরত চলবে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে