ভোটে ফিরলেন টুকু ও দুলু

খালেদার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আজ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুদকের মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা, তা আজ মঙ্গলবার জানা যাবে। তিনটি আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে করা পৃথক রিটের শুনানি শেষে আদেশের দিন ধার্য করা হয়েছে আজ।

বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার আদেশের এ দিন ধার্য করেন।

এদিকে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ বিএনপির দুই প্রার্থী সিরাজগঞ্জ-২ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুুকু এবং নাটোর-২ আসনে সাবেক উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে ইসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের দণ্ডের কার্যকারিতা এর আগে হাইকোর্ট স্থগিত রাখায় বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন। তবে দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত না থাকায় খগড়াছড়ি-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসির সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ।

খালেদা জিয়ার রিটের শুনানি : দুদকের মামলায় ১৭ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি খালেদা জিয়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ এবং বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গত ২ ডিসেম্বর বাছাইয়ে তার সব মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া আপিল ইসিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তে নাকচ হয়ে যায়। পরে গত রবিবার হাইকোর্টে রিট করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। আদালতে তার পক্ষে শুনানি করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী। ইসির পক্ষে শুনানি করেন সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

শুনানিতে অংশ নিয়ে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এর ১২ (১) (ঘ) অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্রগুলো বাতিল করেছেন। সবাই একই আদেশ লিখেছেন। স্বাধীনভাবে কাজ করেছে বলে মনে হয় না। এর পর নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না- বলা হয়েছে। কিন্তু এটা চূড়ান্তভাবে দ-প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যাদের আপিল বিচারাধীন, তাদের ক্ষেত্রে ৬৬ অনুচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হবে না।

তিনি আরও বলেন, দণ্ড স্থগিত করে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নজির রয়েছে। তিনি পরে মন্ত্রীও হন। এ ছাড়া দণ্ড স্থগিত করে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে উচ্চ আদালতের নজির তুলে ধরেন তিনি।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ সরাসরি বাধা। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেন। পরে ৬৬ অনুচ্ছেদের বিধান বিবেচনায় নিয়ে তার এমপি পদ খারিজ করে দেন উচ্চ আদালত। এ সময় আদালত আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কী হবে, সে ব্যাপারে জানতে চান।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপিল বিচারাধীন অবস্থায় এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। এর পর যখন সাজা চূড়ান্ত হলো, তখন তার এমপি পদ খারিজ করা হলো। হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগও সেটি বহাল রেখেছেন। সেই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হবেন।

এর পর অ্যাটর্নি জেনারেল সম্প্রতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপির আমানউল্লাহ আমানসহ পাঁচ প্রার্থীর দণ্ড স্থগিত রাখার আবেদন খারিজের বিষয়টি তুলে ধরেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই পাঁচ জনের ক্ষেত্রে দেওয়া আদেশে হাইকোর্ট বলেছেন, আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সেনটেন্স (দ-) স্থগিত করা যায়, কিন্তু কনভিকশন (অপরাধী সাব্যস্ত) স্থগিত করা যায় না। কনভিকশন স্থগিত করলে আপিল বিচারাধীন থাকে না। দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন। যেটা পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগও বহাল রাখেন।

অন্যদিকে সাবেরা সুলতানার দণ্ড স্থগিত করে হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ আদেশ দেন। পরে হাইকোর্টের একক বেঞ্চের আদেশ আপিল বিভাগ স্থগিত করেছেন। এসব প্রার্থীর কেউই কিন্তু বলেননি আপিল বিচারাধীন আছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ চাই। সবাই বলেছেন আপিল বিচারাধীন, দণ্ড ও কনভিকশন স্থগিত চাই। কিন্তু আদালত দণ্ড স্থগিত করতে পারলেও কনভিকশন স্থগিত করতে পারেন না। এ কারণে দণ্ডিতদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।

আদালত উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আজ মঙ্গলবার আদেশের দিন ধার্য করেন। শুনানির সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘ইলেকশন এক্সপার্ট মিশনের’ আইনজ্ঞ ইরিনি-মারিয়া গোনারি। এজলাস কক্ষের শেষ সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ তাকে দেখে বসার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। তখন শেষ সারির একটি বেঞ্চে আইনজীবীরা তাদের পাশে বসান। বেশকিছু সময় শুনানি পর্যবেক্ষণ করে তিনি চলে যান।

দণ্ডিত দুজন সুযোগ পেলেন : বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দুদকের মামলায় ১৩ বছরের এবং দণ্ডবিধির মামলায় রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সাত বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত। এ কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসি। কিন্তু তাদের দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত থাকায় গতকাল বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ তাদের প্রার্থিতা বৈধ উল্লেখ করে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন।

আদালতে টুকুর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি। দুলুর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএফ হাসান আরিফ, ফিদা এম কামাল, আমিনুল হক হেলাল ও সৈয়দ আল আশাফুর আলী রাজা। পরে আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, ‘ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দুর্নীতির মামলায় সাজা হয়েছিল। হাইকোর্টে আপিল করে জিতলাম।

পরে দুদক আপিল করার পর আপিল বিভাগ পুনঃশুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠান। যখন হাইকোর্টে ২০০৯ সালে এসেছিলাম তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুসারে কনভিকশন ও সেনটেন্স সাসপেন্ড করেছিলেন হাইকোর্ট। এ অর্ডারটা এখনো বহাল আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকে জিতলাম। ওনার (টুকু) মনোনয়নপত্র গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই।’

তিনি আরও বলেন, একেকটি আসনে রাজনৈতিকভাবে কয়েকজনকে প্রার্থী করা হয়েছে। এখন যদি কোনো প্রার্থী ওনার আসনে প্রত্যাহার করতে চায়, তা হলে সেটাও গ্রহণ করতে হবে। সৈয়দ আল আশাফুর আলী রাজা বলেন, আজকের আদেশের ফলে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে