ভোট দেব কাকে

  আবু সাঈদ খান

১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ০১:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও দল দুই-ই বিবেচ্য। দলের সদস্য ও কট্টর সমর্থকদের কাছে দলই বড়, ব্যক্তি তেমন বিবেচ্য নয়। সাধারণ ভোটারদের কাছে কখনো দল, কখনো ব্যক্তি প্রধান বিবেচনার বিষয়ে পরিণত হয়।

যেমন ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ ও ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মানুষ ব্যক্তির দিকে তাকাননি; তারা তাকিয়েছেন জোট/দল ও মার্কার দিকে। ব্যাপক জনগণ ’৫৪তে হক-ভাসানীর নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, ভাষার মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে। নৌকার ধাক্কায় মুসলিম লীগের হোমরা-চোমরারা ধরাশায়ী হলেন। বিশ^বিদ্যালয়ের এক পড়–য়ার কাছে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন পরাজিত হন।

’৭০-এর নির্বাচনে একই আকাক্সক্ষায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় শাণিত হয়ে ব্যাপক জনগণ শেখ মুজিবের নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন। তখন আরাধ্য ছিল ৬ দফা, ১১ দফা ও অর্থনৈতিক সাম্য। নির্বাচনে পাকিস্তান-পছন্দ মুসলিম লীগ-জামায়াত-নেজামে ইসলাম-পিডিপির বাঘা বাঘা নেতা হেরে গেলেন। এমনকি স্বায়ত্তশাসনপন্থি, সমাজতন্ত্রী, ক্লিন ইমেজের নেতা ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ভোট পেলেন না। জনগণ সেøাগান দিল মোজাফফরের কুঁড়েঘর/ভাইঙ্গা-চুইরা নৌকায় ভর। তখন মুক্তিকামী জনতা নৌকার বাইরে যেতে চাইছিলেন না। ভয় ছিলÑ ভোট ভাগ হলে জয় আসবে না। তাই জনগণের একই কথা বটগাছ, কলাগাছ বিচার করব না; শেখের নৌকায় ভোট দেব।

এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এ নির্বাচনকে ’৫৪ বা ’৭০-এর সঙ্গে মেলানো যাবে না। নির্বাচনে মহাজোট বা ঐক্যফ্রন্ট যে জোটই ক্ষমতায় আসুক, রাষ্ট্রব্যবস্থায় তেমন পরিবর্তন ঘটবে না। এক বাক্যে বলা যায়, উভয় জোটই মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করবে। সংবিধান ধর্মীয় লেবাসমুক্ত হবে না। আর চিহ্নিত সন্ত্রাসী-দাগি-খুনি, আমলা, টাকাওয়ালা, চিহ্নিত রাজাকার আর পতিত স্বৈরাচার যেভাবে দুই বড় জোটের মনোনয়ন বাগিয়েছেন; তাতে কী করে বলি অমুক জোট এলে সুশাসন কায়েম হবে, আর তমুক জোট এলে লুটপাট হবে না! বলা বাহুল্য, আমলা, ব্যবসায়ীসহ যে কোনো পেশার মানুষের রাজনীতি করার অধিকার আছে। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে; টাকার জোরে মনোনয়ন খরিদ করে নয়। আপত্তি সেখানেই; রাজনীতি রাজনীতিকদের কাছে নেই। সংসদে রাজনীতিকদের প্রাধান্য নেই। চুয়ান্ন, সত্তর, তেহাত্তরে তো বটেই, ঊনআশির সংসদেও রাজনীতিকদের প্রাধান্য ছিল। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী পেশা থেকে আসা রাজনীতিকরা কমতে কমতে সংসদে এখন তারা সংখ্যালঘু। বর্তমান সংসদে ৬৯ শতাংশ কোটিপতি ব্যবসায়ী। রাজনীতিকদের মধ্যেও যারা কোটিপতি বা কোটিপতি হয়েছেন, তারাই টিকে আছেন। মধ্যবিত্তরা ছিটকে পড়েছেন।

সংসদ ও রাজনীতিতে এখন গাছের চেয়ে আগাছা-পরগাছারই দাপট বেশি। ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের চেয়ে অধিকসংখ্যক হঠাৎ বনে যাওয়া ‘নেতাদের’ কাছেই মার্কা তুলে দেওয়া হয়েছে। মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে শুধু আগন্তুক আমলা, টাকাওয়ালাই নন; রাজনীতি থেকে নিরাপদে থাকা প্রভাবশালীদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যারাও আছেন। সংগীত-অভিনয়-ক্রীড়াঙ্গনের তারকারা আছেন।

মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ দেদার। এমন অভিযোগে একটি দলের শীর্ষনেতা পদ হারিয়েছেন (ওই নেতা অবশ্য পদ হারিয়ে নতুন চাকরি পেয়েছেন)। মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ সর্বক্ষেত্রে সত্য না হলেও মার্কা প্রদানের বিবেচ্য বিষয় পয়সা ও পেশি। যার টাকার জোর নেই, পেশির দাপট নেই; তার আর যে যোগ্যতাই থাক; কপালে মনোনয়ন নেই।

দলগুলো এ ‘নীতি’তে অটুট থাকবে, না নতুন করে ভাববে সেটি তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমরা জনগণ কি এসব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব? আমরা কি চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ঠকবাজ, কালো টাকার মালিক, ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী, রাজনীতি-কারবারিদের ভোট দেব; আমরা কি একাত্তরের ঘাতক-দালাল বা তাদের উত্তরসূরি, পতিত স্বৈরশাসক ও তার শিখ-ীদের ভোট দিয়েই যাব; না, রাজনীতির ময়দান থেকে এসব আবর্জনা সাফ করব ভোটারদের সামনে সেটি বড় প্রশ্ন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ব্যাংক-ডাকাত নির্বাচিত হয়ে আবার যখন ব্যাংক কেলেঙ্কারি করবেন, রাজনীতি-কারবারি সাংসদ যখন দু’হাতে লুটবেন, তখন সে দায় আমাদেরও, ভোটারদেরও।

নির্বাচকম-লীদের মধ্যে কে কী করবেন সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে একজন ভোটার হিসেবে আমি আমার কথা বলতে চাই, যে ঋণখেলাপি আইনের চোখে ধুলা দিয়ে ঋণখেলাপি হয়েছেন, আমার চোখে তিনি সর্বদাই ঋণখেলাপি। তিনি যে মার্কারই হোন; আমি তাকে ভোট দেব না। আমি ভোট দিতে পারি না সেসব রাজনীতি-ব্যবসায়ীকে; ক্ষমতার ছোঁয়ায় যাদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। আমি একাত্তরের সেসব ঘাতক-দালাল বা তাদের প্রেতাত্মাকে ভোট দিতে পারি না, যারা পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা-নারী ধর্ষণ ও নানা অপকর্মে সহায়তা করেছে, কিংবা আজও যারা সেই ঘৃণ্য রাজনীতির ধ্বজা বহন করছে। কী করে ভোট দেব পতিত স্বৈরশাসক ও তার শিখ-ীদের; যাদের হাত নূর হোসেন, ডা. মিলনসহ শত শহীদের রক্তে রঞ্জিত, যারা নানা অপকর্মের হোতা!

শুধু মার্কা দেখে নয়; প্রার্থী দেখে ভোট দেব। সেই প্রার্থী খুঁজছি, যার হাতে রক্তের দাগ নেই, গায়ে কালো টাকার গন্ধ নেই, দুর্নীতি-লুটপাটের আলামত নেই। এমন সৎ, ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিকদের ভোট দিতে চাই।

এবারের নির্বাচনে প্রার্থিত প্রার্থী যদি না পাই, তবে ‘না ভোট’ দিতে চাই। যদিও সে সুযোগ নেই। তবে আগামী নির্বাচনে ‘না ভোট’-এর অধিকার চাই-ই চাই।

আবু সাঈদ খান : লেখক ও সাংবাদিক

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে