নাটক মঞ্চায়নে জাপা

সংসদে হবে বিরোধী দল, এইচএম এরশাদ হবেন বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা জিএম কাদের

  মুহম্মদ আকবর

০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৩৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই জাতীয় পার্টি (জাপা) এবং দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নানা নাটকের জন্ম দেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরেও নানা ঘটনার জন্ম হয়েছিল।

সদ্য সমাপ্ত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও কম নাটক মঞ্চায়ন হয়নি। সকালে এক ধরনের সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পরই বিকালে আসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত। নির্বাচনের ফলের পরও দলটি সরকারে থাকবে, নাকি বিরোধী দলে- তা নিয়েও নানা আলাপ-আলোচনা হয়েছে।

কখনো সরকারে, আবার কখনো বিরোধী দলে থাকার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন জাপার নেতারা। নাটকের সর্বশেষ মঞ্চায়ন হয়েছে গতকাল সকালে। দল থেকে জানানো হয়েছে, জাপা সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করবে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শুক্রবার পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এরশাদ বিরোধী দলেই থাকতে চান। দলীয় প্রধান হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতাও হবেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। পার্র্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় পার্টির কোনো সংসদ সদস্য মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এরশাদের বিবৃতির পর দলের জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান মহাজোটের সঙ্গে আলোচনা করেই ‘দেশের বৃহত্তম স্বার্থে’ একাদশ সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, যে কোনো কারণেই হোক, এখন মহাজোটেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা ধরে নিচ্ছি, এতে সামনে আমাদের ভালো হবে। আমি যেটুকু জানি, চেয়ারম্যান সাহেব মহাজোটের সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর আগে ৩ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ শেষে দলটির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আমরা মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করেছি। তাই অধিকাংশ সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে থাকতে চান। জনগণই তো বিরোধী দল চায়নি। উন্নয়নের স্বার্থে বড় ধরনের বিরোধী দল চায়নি জনগণ।

জিএম কাদের বলেন, আমরা মহাজোটে ছিলাম। মহাজোটের শরিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচন করেছি। আমাদের লক্ষ্য এবং কথা ছিল অভিন্ন। তাই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উন্মুক্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়েও দলটি নির্বাচনের আগে নাটকীয়তার জন্ম দেয়। ২৭ ডিসেম্বর মহাজোটের সিদ্ধান্তই ‘চূড়ান্ত’ বলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ডিগবাজি দেন। ওইদিন রাতে অন্য এক বিবৃতিতে বলেন, মহাজোটের বাইরেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লড়াইয়ে থাকবেন।

এর আগে মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় অসুস্থতা নিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এইচএম এরশাদ ভর্তি হলে শুরু হয় গুঞ্জন। তার অসুস্থতা নিয়েও নানা ধরনের বক্তব্য আসে দলটির নেতাদের কাছ থেকে। ৬ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠান শেষে দলের নেতারা বলেন, রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ৮৮ বছর বয়সী এরশাদ। এরশাদের ভাই জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান কাদের বলেছিলেন, এই বয়সে যতটা অসুস্থ হয় মানুষ, তার ভাই তেমনই অসুস্থ। ওইদিন দলের আয়োজিত সংবিধান সংরক্ষণ দিবসের এক অনুষ্ঠানকালে সিএমইচ থেকে গাউন পরা অবস্থায় বনানীতে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এসে হাজির হন এরশাদ। এসেই বলেছিলেন, ‘যদিও আমি অসুস্থ, উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আজ বলতে চাই যে, কেউ আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমি এগিয়ে যাব।’ এলোমেলোভাবে কিছু কথা বলে চলে যাওয়ার পথে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা স্লোগান তোলেন-‘আওয়ামী লীগের দালালেরা হুশিয়ার সাবধান।’ এ সময় তিনি হাত নাড়িয়ে চলে যান। এর পর এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে কৌতূহল আরও বাড়ে।

১০ ডিসেম্বর চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়েও কম নাটকের জন্ম দেননি। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরতে তিন দফা তারিখ পরিবর্তন করেন এরশাদ। প্রথমে ২০ ডিসেম্বর ফেরার বিষয়টি জানানো হয়। এর পর বলা হয় ২২ ডিসেম্বর দেশে ফিরবেন তিনি। পরে দলের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এরশাদ ২৪ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন। কিন্তু সেদিনও দেশে ফেরেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ৩ দিন আগে ২৭ ডিসেম্বর রাতে দেশে আসেন এরশাদ।

দলের মনোনয়ন নিয়ে ৩ ডিসেম্বর দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে বদল করে যান। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গাকে ওই পদে নিয়োগ দেন। মূলত মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগে রুহুল আমিন হাওলাদারকে বদল করা হয় বলে পরোক্ষভাবে এমন ইঙ্গিত দেন নতুন মহাসচিব। অবশ্য সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে রাঙ্গা বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ আছে। মহাসচিব বদল চলাকালেই ঘটে আরেক ঘটনা। ৮ ডিসেম্বর দলের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, রুহুল আমিন হাওলাদারকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী নিয়োগ করা হয়েছে। হাওলাদার পার্টির চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের সার্বিক সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করবেন। তার পদমর্যাদা হবে- পার্টির চেয়ারম্যানের পরে দ্বিতীয় স্থানে। ওইদিন এরশাদ হাওলাদার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ও অনেক ভালো একটা ছেলে। ওকে আমি সন্তানের মতো জানি।’

৫ বছর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও দলটির চেয়ারম্যান এরশাদ কম নাটকের মঞ্চায়ন করেননি। সে সময় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে হঠাৎই হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতও হন তিনি। তার দল সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসার পাশাপাশি সরকারেও যোগ দেয়। রওশন এরশাদ হন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা।

ক্ষণে ক্ষণে মত পরিবর্তনের কথা স্বীকার করেছেন এরশাদ নিজেও। তিনি প্রায়ই বলেন, তোমরা সব সময় বলো, আমি কথা ঠিক রাখি না। সকালে এক কথা বলি, বিকালে বলি আরেক কথা। এটা কিছুটা হলেও সত্য। কিন্তু আমার অবস্থা তোমরা বুঝতে চাও না। আমার দুঃখের কথা তোমরা শুনতে চাও না। অনেকের প্রশ্ন, তার এই বক্তব্যও কী এমন নাটকেরও অংশ, নাকি তার কথায় অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে