গার্মেন্টসে অসন্তোষ ছয় কারণে

প্রকাশ | ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৩৪

হাসান আল জাভেদ ও আব্দুল্লাহ কাফি
পুরোনো ছবি

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ানো হলেও বেসিক বা মূল মজুরি কমেছে মধ্যম শ্রেণির শ্রমিকদের। নতুন কাঠামোতে ৭টি গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ৪১২ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, কমানো হয়েছে ৪৮ টাকা পর্যন্ত। শ্রমিকদের মতে, নতুন ঘোষণায় মূল বেতনে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। ওভারটাইম ও উৎসব বোনাসের ক্ষেত্রেও তাদের ঠকানো হয়েছে। তাই স্বল্প আয়ের এ শ্রমজীবীদের মধ্যে দানা বেঁধেছে অসন্তোষ। আর তাদের এ অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালছে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী কিছু মহল।

এ খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে চলমান যে অসন্তোষ, এর জন্য মূলত ৬টি কারণ দায়ী। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ বেতন কাঠামো ছাড়াও রয়েছে মালিকদের গাফিলতি, তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সমন্বয়ের অভাব, নতুন বেতন কাঠামো সম্পর্কে শ্রমিকদের সুস্পষ্ট ধারণার অভাব, অতিরিক্ত শ্রমের কারণে মানসিক চাপ এবং স্বার্থান্বেষী মহলের উস্কানি।

বিশ্লেষকদের মতে, সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত বেতন কাঠামো সংশোধনসহ বিরাজমান অন্যান্য সমস্যার নিরসন না হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মার খেতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম খাত তৈরি পোশাকশিল্প, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক গেজেটে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। এতে শ্রমিকদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ও খাদ্যভাতা বাড়ানো হলেও বেসিক বা মূল বেতন বাড়ানো হয়নি। উল্টো জ্যেষ্ঠ পদের দক্ষ শ্রমিকদের (৩ নম্বর গ্রেড) ২০১৩ সালের বেতন কাঠামোর তুলনায় ৪৮ টাকা মূল বেতন কমানো হয়েছে। ৪র্থ গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৮২ টাকা। ৫ম গ্রেডের বেড়েছে ১৬৮ টাকা। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের মূল বেতন বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪১২ টাকা পর্যন্ত।

শ্রমিকদের ভাষ্য, তারা দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করেন। মূল কর্মঘণ্টা তাদের ৮ ঘণ্টা। এর অতিরিক্ত ৪-৬ ঘণ্টা বাড়তি সময় শ্রমের মূল্য নির্ধারিত হয় মূল বেতনের ভিত্তিতে। একইভাবে নির্ধারিত হয় হাজিরা ও উৎসব বোনাসও। কিন্তু নতুন কাঠামোতে বেসিক না বাড়ায় নতুন নিয়মে ওভারটাইম ও উৎসব বোনাসে শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। তাই তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন।

উত্তরার দক্ষিণখান এলাকার চৈতী গার্মেন্টেসের অপারেটর রাবেয়া বেগম বলেন, নতুন বেতন কাঠামোতে আমাদের বেতন ও ওভারটাইমের মজুরি বাড়েনি। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে মূল বেতন ৫১ শতাংশ বাড়ানোর কথা থাকলেও মালিকপক্ষ বলছে, ২৭ শতাংশ বাড়ানোর কথা। এটি মানা যায় না। সঙ্গত কারণেই ন্যায্য দাবি আদায়ে আমরা আন্দোলন করছি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গত ৫ বছরে শ্রমিকদের বেতন বেড়েছে ন্যূনতম প্রায় ৩ হাজার টাকা। কিন্তু ওভারটাইমের মজুরি বাড়েনি। বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা ক্ষুব্ধ। আর তাদের এ ক্ষোভে উস্কানি দিচ্ছে কিছু শ্রমিক সংগঠন। সুযোগ সন্ধানী সংগঠনগুলো চাইছে দেশীয় পোশাকশিল্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে।

তবে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে কোনো উস্কানি আছে বলে মনে করেন না গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি মোশরেফা মিশু। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, মূলত দক্ষ শ্রমিক বা অপারেটরদের বেতনে বৈষম্যের কারণে তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেছেন; দাবি আদায়ের আন্দোলন করছেন। এতে কোনো শ্রমিক সংগঠনের যোগসাজশ নেই। তিনি বলেন, এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা হওয়ার আগেই মালিকরা এ অসন্তোষের সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু তাদের আন্তরিকতার অভাবেই আজ এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মালিকরা সচরাচর কারখানায় যান না; কর্মকর্তা দিয়ে পরিচালনা করেন। তাই তারা শ্রমিকদের ভাষা বোঝেন না।

মোশরেফা মিশু আরও বলেন, শ্রমিকদের কার কত বেতন বেড়েছে, তা জানাতে কোনো নোটিশ প্রদর্শন করা হচ্ছে না। এটিও চলমান অসন্তোষের জন্য দায়ী। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের অসন্তোষ নিরসনে মালিকদের আন্তরিক হওয়া জরুরি।

অন্যদিকে গার্মেন্টস মালিকদের মতে, বেতন কাঠামোয় মূল বেতন কমানো হয়েছে তৃতীয় গ্রেডের। ২০১৩ সালের কাঠামোয় একজন শ্রমিক বেসিক পেতেন ৫ হাজার ২শ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোয় বেসিক ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৫২ টাকা। এতে ৪৮ টাকা বেতন কমেছে সত্যি। কিন্তু মাসে তাদের মোট বেতন বেড়েছে ৩ হাজার টাকা।

রাজধানীর কালশীর এক গার্মেন্টস মালিক বলেন, সরকার তৈরি পোশাকশিল্পে উৎসে কর দশমিক ৬ থেকে দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে এবং ৩ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে সত্যি। কিন্তু সরকারই শ্রমিকদের বেতন ৫১ শতাংশ বাড়িয়েছে। অথচ বিদেশি ক্রেতারা আমাদের বাড়তি দাম দিচ্ছেন না। উল্টো তারা বলছেন, শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে। এর পাশাপাশি মালিকদের গাফিলতিতে শ্রমিকরা তৃতীয়পক্ষের উস্কানিতে কান দিচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবকটি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে বেতন কাঠামোর সুপারিশ পাঠানো হয়। এতে খোদ বিজিএমইএ’র সব ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকদের মতামতও নেওয়া হয়নি। একজন শীর্ষ কর্মকর্তার একতরফা সুপারিশ এবং বেসিক বেতনে শুভঙ্করের ফাঁকির বিষয়টি না বুঝে শ্রম দপ্তর তা গেজেট আকারে প্রকাশও করে ফেলেছে। ১৯৯৭, ২০০৬ ও ২০১৩ সালের বেতন কাঠামো অনুসরণ না করে মোট বেতন বাড়ানোর নামে কর্তৃপক্ষের ভাতা বাড়ানোর উদ্ভট কৌশলের কারণে আজ এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

বেতন কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভকে অযৌক্তিক মনে করেন বিজিএমইএ’র সহসভাপতি মোহাম্মদ নাসির। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এ কাঠামো বাস্তবায়ন হচ্ছে। রাস্তা অবরোধ করে ভাঙচুর করা কোনোভাবেই ঠিক না। তিনি বলেন, আমরা নতুন বেতন কাঠামোতে অসঙ্গতি দেখছি না। এর পরও বাণিজ্যমন্ত্রী, শ্রম প্রতিমন্ত্রীসহ মালিক ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ে বসে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি শিগগিরই একটি সমাধান আসবে।

মোহাম্মদ নাসির বলেন, তৃতীয় কোনো পক্ষের উস্কানিতে শ্রমিকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। বেতন না পাওয়া পর্যন্ত কে কম বেতন পেলেন, তা কীভাবে তারা বুঝবেন? তাই বেতন প্রদানের পর বোঝা যাবে, কোথাও কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা।

গার্মেন্ট শ্রমিকরা বলছেন, নতুন বেতন কাঠামোয় অদক্ষ শ্রমিকরা খুশি। কারণ তাদের বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। কিন্তু দক্ষ শ্রমিকদের বেতন তেমন বাড়েনি। অথচ দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা অনেক এবং দেশে এখনো দক্ষ শ্রমিক চাহিদার তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ কম রয়েছে। তাই তাদের চাহিদা থাকলেও বেতন কাঠামোর ফাঁদে পড়েছেন দক্ষ শ্রমিকরা। অথচ বেতন বাড়ানোর যুক্তিতে কারখানা পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের জন্য চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন।