অনিয়মের প্রতিবেদন দেয়নি ধানের শীষের ১১৭ প্রার্থী

  নজরুল ইসলাম

১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেঁধে দেওয়া সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রতিবেদন জমা হয়নি ১১৭ আসনের ধানের শীষসহ সমর্থিত প্রার্থীদের। ১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ছিল প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ৩ জানুয়ারি বিএনপির দুই জোটসঙ্গী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোট প্রার্থীরা বৈঠক করেন। ১০ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যেক প্রার্থীকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, তিনশ আসনের মধ্যে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৮৩ আসনের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৮৩ প্রার্থী প্রতিবেদন জমা

দিয়েছেন। আশা করি দু-একদিনের মধ্যে সবাই জমা দেবেন। বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নানা মাধ্যমে তারা প্রতিবেদন পাচ্ছেন। এর মধ্যে ডাক যোগ, কুরিয়ার সার্ভিস অথবা প্রার্থী নিজে অথবা বাহক মাধ্যমে এসব প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনো অনেক আসনে নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতা চলমান। নেতাকর্মীরা এখনো বাড়ি ফিরতে পারছেন না। মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন প্রার্থীরা। কোনো কোনো প্রার্থী অসুস্থ, আবার অনেকে কারাবন্দি রয়েছেন। কোনো কোনো প্রার্থীর অনীহা এবং কুরিয়ারের বিলম্বে বিতরণের কারণেও সব আসনের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

চাঁদপুর-৩ আসনের প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক জানান, তার নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনের পরও সহিংসতা বন্ধ হয়নি। এখনো নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চলছে, তাদের বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত থেকে তার এলাকার প্রায় ১২শ নেতাকর্মী ছাড়াও নিজের মামলার জামিন নিতে হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের অনিয়ম আর ভোট জালিয়াতির তথ্য থাকার পরও সময়মতো কেন্দ্রে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি।

ঢাকা-১২ আসনের ধনের শীষের প্রার্থী ও যুবদলের সভপতি সাইফুল আলম নীরব জানান, এখনো প্রতিবেদন জমা দেননি। ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে তানভীর আহমেদ রবিন জানান, নির্বাচনের দিন বাবার ওপর হামলা হয়েছিল। তিনি হাসপাতাল থেকে দুদিন আগে বাসায় ফিরেছেন। এখনো তিনি ঠিকভাবে হাঁটতে পারছেন না। আমরা তথ্য সংগ্রহ করেছি। আজ শনিবার জমা দেবেন বলে জানান।

কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন রাজশাহী-২ আসনের মিজানুর রহমান মিনু ও রাজশাহী-৩ আসনের শফিকুল হক মিলন, খুলনা-২ আসনের নজরুল ইসলাম মঞ্জু। নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, কেন্দ্রের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা, পুলিশি হয়রানি, ভোটের ৩ দিন আগে থেকে নির্বাচনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভীতি প্রদর্শন ও হামলা, ভোটারদের ভয় দেখানোসহ নানা বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন।

বিএনপির দুই জোটসঙ্গী নির্বাচনপরবর্তী ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে ৩ জানুয়ারি বৈঠক করে। ওই বৈঠকে সাত দিনের মধ্যে ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরে যেসব অনিয়ম, কারচুপি এবং হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে, তার আসনভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত জমা দিতে প্রার্থীদের নির্দেশ দেয়। ওই বৈঠকে ১৭৮ প্রার্থী অংশগ্রহণ করে। এ জন্য প্রতি আসনের প্রার্থীদের কাছে বিস্তারিত বিবরণের দুটি ছক সরবরাহ করা হয়। ছকের একটিতে যেসব বিষয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা হচ্ছেÑ প্রার্থীর নিজ ও তার পরিবারের ওপর হামলায় আহত এবং সম্পত্তি ক্ষতির তথ্য-ছবি; পোলিং এজেন্ট, প্রার্থীর সমন্বয়কারী, সমর্থক নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা ভয়ভীতি, অন্যায় আচরণ, মারধর ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ভোট জালিয়াতির ধরন ইত্যাদি তথ্য চাওয়া হয়। ছকের অন্যটিতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নিহত নেতাকর্মীদের তালিকাসহ হত্যার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, ৩০ ডিসেম্বরের এমন একটি নির্বাচন হয়েছে, যা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের চেয়েও ভয়াবহ। তাই ক্ষমতাসীন দল এ নির্বাচনের অনিয়ম, অসঙ্গতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যা যা করেছে, তার তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত করে দলিল আকারে সংরক্ষণ করা হবে। তারা মনে করছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল এক রকম। আর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষের ভোটাধিকার হরণের নতুন নজির গড়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয় বিএনপি। এর মধ্যে ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলো ছিল। শুধু চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ২০-দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব) অলি আহমদ ছাতা প্রতীকে ও কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেন। আইনি জটিলতায় ২৮২ আসনে ধানের শীষ প্রতীক দেখা যায়। শূন্য আসনে স্বতন্ত্র অথবা অন্যদের স্থানীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল।

হামলা-মামলা-লুটপাটের তথ্য সংগ্রহে বিএনপির পৃথক ৩ কমিটি

এ দিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা-মামলা-লুটপাটের তথ্য সংগ্রহে আলাদা ৩টি কমিটি করেছে বিএনপি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা-মামলা-লুটপাটসহ আরও অনেক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে ৩টি কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা। প্রত্যেক কমিটি পৃথক বিষয় নিয়ে কাজ করছে। তিনি নিজেও একটি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান এ্যানী।

জানা গেছে, দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে মামলা-হামলা সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের তালিকা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে আইনগত সুবিধার বিষয়টি দেখবে এ কমিটি।

৬ সদস্যের আরেকটি কমিটি করা হয়েছে দলের প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীকে আহ্বায়ক করে। এ কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, আহত-নিহতের সংখ্যা, বাড়িঘর ভায়চুর ও আগুন, দলের কার্যালয় ভাঙচুরের তথ্য সংগ্রহ করছেন।

এ ছাড়া বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে আহ্বায়ক করে আরেকটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি নারী প্রার্থী ও নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলার তথ্য সংগ্রহসহ আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে