শীলার প্রেমে জঙ্গি মুসা

  শাহজাহান আকন্দ শুভ

২৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ১০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর ও জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সামরিক শাখার অন্যতম শীর্ষ নেতা জাহিদুল ইসলাম ২ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর রূপনগরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনার আগে তিনি স্ত্রী জেবুন্নাহার শীলা ও দুই কন্যাসন্তানকে রূপনগরের বাসা থেকে আজিমপুরের আস্তানায় তোলেন। জাহিদ নিহত হওয়ার পর শীলার ওপর চোখ পড়ে সংগঠনের আরেক জঙ্গি নেতা মাইনুল ইসলাম ওরফে মুসার। শীলাকে বিয়ে করার প্রস্তুতিও নেন মুসা। আর এজন্য সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ মাস ইদ্দতকালীন সময় শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল তিনি। কিন্তু আশকোনার আস্তানায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের অভিযানকালে শীলা দেড় বছরের শিশুকন্যাসহ আত্মসমর্পণ করায় মুসার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ওদিকে শীলার প্রতি আকর্ষণের বিষয়টি জানার পর মুসার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন তার স্ত্রী তৃষামণি। ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডে এই নারী জঙ্গি মুসার এসব অপকীর্তির কথা অকপটে বলে দিয়েছেন পুলিশের কাছে।

তৃষামণি পুলিশকে বলেছেন, মুসার প্ররোচনাতেই এক সময় জঙ্গিবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যখন বুঝলেন জঙ্গিপনা ভুলপথ, তখন এই রাস্তা থেকে ফিরতে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মৃত্যুভয়ের কারণে তিনি কখনো আস্তানা থেকে বেরোতে পারেননি। আশকোনার আস্তানায় পুলিশের হঠাৎ অভিযান তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ করে দিয়েছে। যে কারণে পুলিশি অভিযানের সময় বাইরে থেকে ফোনে মুসা তাকে বারবার আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করলেও সে পথ বেছে না নিয়ে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমপর্ণ করেন। পুলিশ অভিযানের রাতে ৫০ নম্বর পূর্ব আশকোনার ৩তলা বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খোঁজে গেলে তৃষামণি জানালা দিয়ে তাদের ইশারা করে কাছে ডাকেন। তারপর নিচু স্বরে বলেন, তাদের বাসাটিই জঙ্গি আস্তানা। এখানে ৩ জন জঙ্গি আছে পাশের রুমে। এর পর সারারাত মোট ৯টি চিরকুট পুলিশের কাছে চালাচালি করেছিল ওই আস্তানায় থাকা নারী জঙ্গিরা। বেশিরভাগ চিরকুট পুলিশের কাছে লেখেন তৃষামণি। আস্তানায় কজন জঙ্গি আছে, গোলাবারুদ কী পরিমাণ আছে তা চিরকুটের মাধ্যমে তৃষামণিই পুলিশকে প্রথম জানিয়েছিলেন।

তিনি একটি চিরকুটে লেখেন, ‘আমি মরতে চাই না। বাঁচতে চাই। আপনারা আমাকে বাঁচান।’

শীলা একটি চিরকুট লিখেছিলেন তার মায়ের কাছে থাকা বড় মেয়ের উদ্দেশে। তাতে তিনি মেয়েকে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন তার অবর্তমানে কীভাবে চলতে হবে, জীবন যাপন করতে হবে। চিরকুটে মেয়েকে বারবার ধর্মীয় নানা বিষয় মেনে চলারও পরামর্শ দিয়েছিলেন শীলা। মেয়েকে জঙ্গিবাদের দীক্ষাও দিয়েছিলেন। আজিমপুরের আস্তানা থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর পুলিশ তাকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। দীর্ঘদিন স্বজনদের সঙ্গে থেকে এই কোমলমতি শিশুর মগজ থেকে জঙ্গিবাদের খারাপ দিকগুলো বেরিয়ে গেছে। এখন সে স্বাভাবিক।

তৃষামণি ও শীলা দুজনই এখন মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে রয়েছেন। ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্ত কর্মকর্তাসহ একাধিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। তৃষামণির মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে তার স্বামী মুসার অপকর্মের অনেক অজানা কাহিনি। তৃষামণিকে গতকাল জেরা করে পুলিশ নতুন কিছু তথ্য পেয়েছে মুসা সম্পর্কে। ২ সেপ্টেম্বর জাহিদ মারা যাওয়ার পর মুসা আজিমপুর থেকে শীলা ও শীলার দুই মেয়েকে নিয়ে অন্য একটি আস্তানায় ওঠেন। আর ৭-৮ বছর বয়সী বড় মেয়েকে আজিমপুরের আস্তানায় রেখে আসেন। পরে পুলিশ ১০ সেপ্টেম্বর শীলার বড় মেয়েকে আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার করে।

জাহিদ মারা যাওয়ার পর শীলাকে বিয়ের পরিকল্পনা করেন মুসা। ইদ্দতকাল পার হলেই তৃষামণিকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে শীলাকে বিয়ে করতেন তিনি।

নব্যধারার জেএমবির রীতি অনুযায়ী সংগঠনের কোনো সদস্য মারা গেলে তার স্ত্রীকে সংগঠনের আরেক সদস্য বিয়ে করে থাকে। আবার কোনো সদস্য কারাগারে গেলে ৩-৪ মাস পর তার স্ত্রীকে বিয়ে করার প্রচলন রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে