ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ডলার

  হারুন-অর-রশিদ

১০ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৭, ১০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববাজারে বাড়ছে ডলারের দাম। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে ডলার। বৈধ কেনাবেচায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকলেও খোলাবাজারে টাকার মান কমেছে। এ ছাড়া ব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবধান ৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ডলারের দাম বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে নগদ ডলার কমে যাওয়ার পেছনে অর্থপাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্র জানায়, ৩ জানুয়ারি ব্যাংকগুলোয় নগদ ডলারের মজুদ কমে ৭২ লাখ ৫০ হাজারে নেমে এসেছে। গত বছর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও ব্যাংকগুলোর কাছে ৯০ লাখ ৩ হাজার নগদ ডলার মজুদ ছিল। গত অক্টোবর শেষে ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার। গত ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলোর কাছে গড়ে ২ কোটি ৭০ লাখ, ২০১৪ সালে ২ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০১৩ সালে গড়ে ২ কোটি নগদ ডলার মজুদ ছিল। পুরো সময়জুড়ে টাকার বিপরীতে ডলারের মান স্থিতিশীল ছিল। অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে, ওই সব দেশের মুদ্রার মান কমেছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সারা বিশ্বে ডলারের দাম বেশি। এর অর্থ অন্য দেশে ডলারের বিপরীতে আয় বেড়েছে। এই বাড়তি আয়ের আশায় অনেকেই ডলার বিদেশে পাচার করে নিয়ে যেতে পারেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে আন্তঃব্যাংক ডলার কেনাবেচা হচ্ছে ৭৭ থেকে ৭৮ টাকায়। অথচ খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়। প্রায় ৭ থেকে ৮ টাকা ব্যবধান। এর ফলে হুন্ডির মাধ্যমে ডলার লেনদেন বেড়ে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, হজ, শিা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি ভারতে বড় দুটি রুপির নোট বাতিল করায় সেখানে ভ্রমণেচ্ছুরা এখন রুপির তুলনায় ডলার বেশি নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারে ডলার দরের পার্থক্যের কারণে এসব ব্যক্তির অধিকাংশই বিদেশ যাওয়ার আগে ব্যাংক থেকে ডলার কিনলেও এসে বিক্রি করছেন খোলাবাজারে। যে কারণে ব্যাংকে নগদ ডলারের মজুদ কমছে। যদিও আমদানি-রপ্তানির জন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরভিত্তিক তথা নন-ফিজিক্যাল ফর্মে বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ রয়েছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেন, হুন্ডি বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স কমেছে। বর্তমানে বাজারে নগদ ডলারের সংকট রয়েছে। সংকট মেটাতে ডলার আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

আন্তঃব্যাংকিং কেনাবেচায় গত বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৭৮ টাকা ৫০ পয়সা। গতকাল সোমবার ৭৮ টাকা ৭০ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে মাত্র ২০ পয়সা। তবে সাধারণ মানুষের কাছে ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাংকভেদে ৮৩ থেকে ৮৪ টাকা নেওয়া হচ্ছে। খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেটে) ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৬ থেকে ৮৮ টাকায়। আগেও খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হতো, তবে ব্যাংকের থেকে ১ থেকে ২ টাকা দাম কমবেশি ছিল। ব্যাংকের থেকে দাম ৪ থেকে ৫ টাকা কমবেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকিং চ্যানেলে নগদ ডলারের তীব্র সংকটের কারণে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বিদেশগামীরা। আবার বিদেশ থেকে ফিরে অবশিষ্ট ডলার বেশি দামে খোলাবাজারের বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে খোলাবাজারে ডলারে চলে যাচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নমিনাল রেট স্থিতিশীল রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ডলারের বিপরীতে টাকার প্রকৃত কার্যকর বিনিময়মূল্য আরও কম। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলাবাজারে ডলারের দাম বেশি। এই ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবধান অনেক বেড়ে গেছে। গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বর নগদ ডলার ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবধান ছিল ২ টাকা ২৩ পয়সা। গত বছরে ডিসেম্বরে এই ব্যবধান দ্বিগুণ হয়ে ৪ টাকা ৪২ পয়সায় নেমে এসেছে।

ডলার শক্তিশালী হওয়ায় এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই দেশের অর্থনীতিতে পড়বে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ডলার শক্তিশালী হলে স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানিতে সুবিধা পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে বৈধ পন্থায় দেশের বাইরে ডলার রাখার পাশাপাশি অবৈধ পন্থায় পাঠানোর প্রবণতাও আরও বাড়বে। তবে রেমিট্যান্স প্রেরণকারী প্রবাসী শ্রমিকরাও লাভবান হবেন।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রাপাচার হচ্ছে। এই পাচারে অন্যতম মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, হুন্ডি ও নগদ ডলার বহন করা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার। ২০১০ সালে পাচার হয় ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি, ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ও ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ডলার অবৈধ পন্থায় দেশের বাইরে চলে গেছে। আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যমে। আলোচ্য দশ বছরে এ মাধ্যমে ৮০৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ১৪৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৮৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অর্থপাচারের আশঙ্কা করা হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম কমলেও প্রতিবছরই এ খাতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০৯ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে। আগের বছরে একই সময় ছিল ১১৪ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালের অর্থপাচারের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ার ঘটনা হুন্ডি হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। বাজারে নগদ ডলার সংকটের পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দায়ী। বিনিময়মূল্য ঠিক রাখতে গিয়ে নগদ ডলার কিনে রাখছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে