দেশের বিশাল বাজার চীনের দখলে

প্রকাশ | ১১ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৭, ১৪:১২

গোলাম রাব্বানী

ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই শৈশবীয় আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ খেলনা। দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৪০ শতাংশই শিশু। সেই হিসেবে খেলনার বাজারও বেশ বিস্তৃত। অথচ এই বাজার এখন পুরোটাই আমদানিনির্ভর। একটা সময় আবহমান বাংলায় বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে মেলার আয়োজন করা হতো। সেসব মেলায় শিশুদের খেলনা পাওয়া যেত। কিন্তু সেসব খেলনা এখন সেকেলে হয়ে গেছে; এসবে লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এক্ষেত্রে দেশের খেলনার বাজার প্রায় পুরোটাই দখল করে রেখেছে চীন। ক্ষেত্রবিশেষে এসব খেলনা বিক্রি হচ্ছে পাঁচ থেকে দশগুণ বেশি দামেও। অথচ শ্রমের মূল্যের বৈশ্বিক বিচারে এদেশেই স্বল্প ব্যয়ে খেলনা কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। যেসব প্রযুক্তির কারণে বিদেশি খেলনাগুলো শিশুদের আকৃষ্ট করছে, সেসবও আহামরি কিছু নয়, দেশেই প্রস্তুত করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে বিশাল একটি শিল্প খাত বিকশিত হতে পারে। উপরন্তু আমদানির মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার পরিবর্তে বিপুলসংখ্যক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

দেশে খেলনা তৈরির স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানার সংখ্যা খুবই কম। তথ্যমতে, দেশে খেলনা তৈরির ২০০টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সবগুলোই আমদানিকৃত খেলনা সংযোজন (অ্যাসেমব্লিং) করার। কিছু কারখানা অবশ্য খেলনা তৈরি করছে। এক্ষেত্রে চীনেরও কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থাকছে।

সূত্র জানায়, দেশে প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি টাকার খেলনার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সারা দেশের চাহিদা অনুযায়ী ৬৫ শতাংশ খেলনা আমদানি হয় বিদেশ থেকে। বছরে এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। আর নগরভিত্তিক হিসেবে অন্তত ৯০ শতাংশ খেলনাই আমদানিকৃত। বিদেশ থেকে এনে গড়ে ৯২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। তাই আমদানিকৃত খেলনা ন্যায্যদামে বিক্রি হলেও দেশে তৈরি খেলনার দ্বিগুণ দাম দাঁড়ায়।

এ খাতের একাধিক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া যায়, তাতে ছোট আকারের একটি কারখানা তৈরিতে ব্যয় হয় ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। তবে এমন কারখানা আমদানিকৃত খেলনার বাজারে ধোপেই টিকবে না। মানসম্মত কারখানা করতে হলে প্রয়োজন প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের। এদেশের অনেক উদ্যোক্তাই এই পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী। কিন্তু এ খাতের বিকাশের জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট যে নীতিমালা প্রয়োজন, তা নেই।

এ শিল্পের বিকাশে সর্বপ্রথম দরকার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। এক্ষেত্রে খেলনাশিল্পের বিকাশে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় দেওয়া; সহজ শর্তে ঋণদান এবং অন্যান্য আইনি সহায়তা দিতে হবে। সম্ভব হলে আগামী ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দিতে হবে যেন শিল্পটি দাঁড়িয়ে যায় এবং বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এনডিসি আমাদের সময়কে বলেন, খেলনাসামগ্রীর অন্যতম একটি খাত হচ্ছে পুতুল। এটি নিয়ে বিসিক কাজ করছে। তারা প্রয়োজন মনে করলে এই খাতে আরও কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের খেলনার বাজারের দিকে দৃষ্টি রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেরও। সম্প্রতি সে দেশের উদ্যোক্তারা এখানে মেলা করার জন্য দাপ্তরিক আবেদন ছাড়াও তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ টয় মার্চেন্ট, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এ খাত বিকশিত হলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। আগ্রহী দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরও অভাব হবে না বলে অ্যাসোসিয়েশন মনে করে। সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশে উৎপাদিত খেলনাসামগ্রী বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

দেশে খেলনা সামগ্রীর আরও একটি বড় বাজার হচ্ছে কুটির ও কারুশিল্পের। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই ছোট ছোট আকারে নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করে সেগুলো বাজারজাত করছে। তবে এগুলো যতটা না খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি শোপিস হিসেবে। প্রধানত এগুলো খেলনার বাজারে প্রভাবই ফেলতে পারছে না। কাপড়, মোম, বেত, কাঠ এসব সামগ্রী দিয়ে হাতে তৈরি ছোট ছোট খেলনা তৈরি করছে বিসিক; দামও বেশি। বিসিক তাদের পণ্যের বিকাশ ও দেশীয় ঐতিহ্য তুলে ধরতে মেলার আয়োজন করে সীমিত আকারে। সেখানেই তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হয়।

বাংলাদেশ টয় মার্চেন্ট, ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাজি মো. শাহাজান মজুমদার বলেন, এ খাত নিয়ে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে পারে বাংলাদেশ এবং সেই স্বপ্ন মিথ্যে হবে না। এদেশের তরুণরাই এ শিল্পের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে সক্ষম।