ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত গ্যাংস্টার গ্রুপ

প্রকাশ | ১১ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৭, ১৫:১৬

হাসান আল জাভেদ

উত্তরার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত নাইন স্টার গ্রুপের প্রধান রাজু ওরফে তালাচাবি রাজু। তালাচাবি মেরামতকারী দরিদ্র বাবা খরচ জোগাতে না পারায় স্কুল থেকে ঝরে পড়ে সে। একই স্কুলের ছাত্র ডিসকো গ্রুপের রায়হান আহমেদ ওরফে সেতু। খেলার মাঠ, কাস বিরতির আড্ডায় দুজনের মধ্যে ভাববিনিময় ছিল দারুণ। সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের মাঝেই একদিন কথাকাটাকাটি থেকে স্কুলের বড়ভাই রাজুকে মারধর করে সেতু। কিন্তু সেদিন কোনো জবাবই দিতে পারেনি রাজু। সেই প্রতিশোধ জিইয়ে রেখে নিজের মতো স্কুল ঝরেপড়া কিশোরদের নিয়ে গঠন করে নাইন স্টার গ্রুপ।

শুরুতে ৯ কিশোরকে নিয়ে ওই গ্রুপ গড়ে তোলা হলেও পরে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ জনে। এবার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। পুরনো শুত্রু সেতুকে মারধর করে রাজু। ইন্টারমিডিয়েট প্রথমবর্ষ থেকে ঝরে পড়ে সেতুও। গড়ে তুলে ডিসকো গ্রুপ নামে আলাদা একটি গ্যাংস্টার গ্রুপ। মাঝেমধ্যেই দুপক্ষের চলে মহড়া আর মারামারি। এভাবেই সৃষ্টি বিরোধের। বিবদমান দুগ্রুপের বলি আদনান কবির হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়েই এসব তথ্য পান পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে গ্রেপ্তারকৃত খন্দকার মেহেরাব হোসেন গতকাল ঢাকা মহানগর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় সে সরাসরি উপস্থিত থাকার কথাও স্বীকার করেছে। তবে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, ভয় দেখাতেই নাইন স্টার গ্রুপের সদস্য আদনান কবিরকে আঘাত করা হয় বলে তার দাবি। হত্যাকাণ্ডের সময় তার মতো আরও ৬ জন সরাসরি উপস্থিত ছিল বলেও তথ্য দিয়েছে মেহেরাব।

পুলিশ জানায়, প্রতিশোধ নিতে গ্যাংস্টার গ্রুপ সৃষ্টি হলেও এরা স্কুল-কলেজছাত্রীদের উত্ত্যক্ত, এলাকায় উৎপাত, গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চস্বরের গান বাজিয়ে পার্টি করা, রাস্তায় দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে হর্ন বাজিয়ে মানুষকে বিরক্ত করত। বখাটে কিশোরদের সঙ্গে একসময় স্কুল-কলেজের ঝরেপড়া ছাত্ররা যোগ দিলেও প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরে ধনীর দুলালরা যোগ দেয়। এর মধ্যে ডিসকো গ্রুপের মেহেরাব হোসেনের বাবা সৌদি প্রবাসী। নাফিজ আলম ওরফে ডন রাউজক উত্তরা মডেল কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র। আরেক কিশোর উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের ছাত্র। তার বাবা ময়মনসিংহ জেলা দায়রা জজ ছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয়রা জানায়, উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকাজুড়ে বিভিন্ন ফ্ল্যাট বাসায় গড়ে উঠেছে বেশকিছু মিনি পতিতালয়। সেখানেও এসব কিশোর অপরাধী বিভিন্ন সময় খদ্দেরদের আটকে রেখে মোবাইল ফোনসহ টাকা-পয়সা আদায় করত। সেই টাকার বড় একটি অংশ ব্যয় হতো ইয়াবা সেবনে। শুধু তাই নয়, গত কয়েক মাস আগে উত্তরা পশ্চিম থানার সংলগ্ন সড়কে এক মাছ ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে জখম করে সেতু গ্রুপের রাকিব, আতাউর, সজিব। বিভিন্ন সময় তাদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও হয়। কিন্তু পরিবার থানায় গিয়ে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনে। এমনকি পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও কিশোর বয়সের সুবাদে তারা ছাড়া পেয়ে যায়।

এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আলী হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, নাইন স্টার গ্রুপ ও ডিসকো গ্রুপের মধ্যে তেমন কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তদন্তে জানতে পেরেছি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছিল রাজু ও সেতুর মধ্যে। যে কারণে একে অপরকে বিভিন্ন সময়ে মারধরও করে। দুজনের দ্বন্দ্বের বলি হয় আদনান কবির।

তিনি জানান, গত এক বছরে ২০ জনের মতো কিশোরকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে অনেককেই তাদের পরিবার মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়। পরে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে বলে কোনো অভিযোগ আসেনি। আর যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল এমন পাঁচ থেকে ছয়জনকে আদালতে চালান করা হয়। অবশ্য তারা ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছে।

পুলিশ জানায়, রাজুর পরিবার উত্তরার তুরাগে বসবাস করত। পরে তার পরিবার উত্তরা হাউজিংয়ের আহালিয়া দলিপাড়ায় চলে আসে। সেখান থেকেই ২২ বছরের রাজুর বিপদে পা রাখা।

মামলার তদন্তকারী সূত্র বলছে, ডিসকো গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম হলো রাকিব, আতাউর, সজিব, নাফিজ মো. আলম ওরফে ডন, নাঈমুর রহমান অনিক, সাদাফ জাকির, রবিউল ইসলাম, মো. আখতারুজ্জামান ছোটন, আহমেদ জিয়ান, খন্দকার শুভ ও নাজমুস সাকিব। এর মধ্যে ডন, অনিক, সাদাফ, রবিউল, ছোটন, জিয়ান, শুভ ও সাকিব এই হত্যা মামলার আসামি। এর বাইরেও হত্যাকাণ্ডের পর একাধিক কিশোরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুগ্রুপের আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক আমাদের সময়কে বলেন, এ কিশোর অপরাধীদের পরিবার সন্তানদের বেলায় তেমন একটা খবর নিত না। এমনকি পুলিশের সহায়তাও চাইত না।

এদিকে গত শুক্রবার উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে সন্ত্রাসীরা খেলার মাঠে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে। চিকিৎসার জন্য তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় আদনানের বাবা কবির হোসেন বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় নয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দুই এজাহারনামী আসামি নাফিজ ওরফে ডন এবং মেহেরাব হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করছে।

 

 

"