২ শিশুকে হত্যার পর আত্মঘাতী মা

পান্তা নিয়ে ঝগড়া গড়াল নির্মমতায়

  হাবিব রহমান

১২ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সোমবার সকাল। মো. শামীম হোসেনের জন্য পান্তা ভাত আর ডিমভাজি নিয়ে হাজির হন তার স্ত্রী আনিকা আক্তার। পান্তা দেখে ক্ষেপে যান শামীম। এ নিয়ে শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল ঝগড়া। একপর্যায়ে আনিকাকে শামীম বলেন, ‘তুই ফাঁসি নিয়ে মরতে পারিস না?’ আনিকার বাবা-মাকে উদ্দেশে করেও গালি দেন। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে যান। আনিকার স্বজন ও পুলিশের ধারণাÑ স্বামীর এই কথার কারণেই দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন আনিকা। তবে শামীম-আনিকা দম্পতির প্রতিবেশীরা জানান, তাদের মধ্যে এর আগে তেমন একটা ঝগড়া হতে দেখেননি তারা।

অবশ্য পুলিশ বলছে, শুধু ঝগড়া না অন্য কোনো বিষয় এখানে কাজ করেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

অভিযুক্ত শামীমকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠিয়ে দুই দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ। কিন্তু মামলার মূল নথি আদালতে না থাকায় ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক প্রণব কুমার শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন। শামীমকে একমাত্র আসামি করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গতকাল দুপুরে দারুসসালাম থানায় হত্যা মামলা করেছেন আনিকার মা নাদিরা বেগম।

এদিকে নিহত দুই শিশু মরিয়ম ওরফে শামীমা (৫) ও আব্দুল্লাহ (২) এবং তাদের মায়ের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ বিশ্বাস। তিনি জানান, শিশু দুটির গলার শ্বাসনালি কাটা ছিল। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শিশু দুটির মায়ের গলায়ও একটি দাগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ভিসেরা সংগ্রহ করে মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের আগে লাশ তিনটির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন দারুলসালাম থানার এসআই মো. নওশের আলী।

দারুসসালাম থানার ছোট দিয়াবাড়ি বেড়িবাঁধের পাশে বাইতুল আমান জামে মসজিদের গলির ভেতরে ১৯ নম্বর টিনশেড বাড়ি। একই মালিকের পাশাপাশি ২৯টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে এক পাশে ৪টি করে উভয় পাশে ৮টি কক্ষ। লোহার গেট দিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলে বামপাশের প্রথম কক্ষটি দেখা যাবে। ওই ঘরটিতেই দুই শিশুসন্তান নিয়ে থাকতেন শামীম-আনিকা। কক্ষে ঢোকার আগে বারান্দার মতো ছোট একটি জায়গায় ৪টি গ্যাসের চুলা। ওই বাড়ির বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া নি¤œ আয়ের। তাদের অধিকাংশই পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। সরেজমিন গতকাল দুপুরের দিকে বেশিরভাগ কক্ষের দরজা বন্ধ দেখা যায়।

পাওয়া গেল গৃহবধূ মৌসুমী আক্তারকে। এখানে ভাড়া থাকেন। তিনি জানান, দেড় বছর আগে শামীমের পরিবার এখানে বাসা ভাড়া নেয়। আনিকা চাকরি না করায় ঘরেই থাকতেন। তেমন একটা মিশতেন না কারও সঙ্গে। তাদের কক্ষের দরজা সবসময় বন্ধ থাকত। তাদের আগে কখনো ঝগড়া করতে দেখা যায়নি। এমন ঘটনা কেন ঘটল বুঝতে পারছেন না মৌসুমী।

দারুসসালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুকুল আলম বলেন, শামীমকে মঙ্গলবার রাতে আটকের পর গতকাল দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি হত্যাকা- সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। অবশ্য ঘটনার দিন সকালে ভাত খাওয়া নিয়ে স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে গালাগাল করার কথা স্বীকার করেছেন শামীম।

শামীমকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, পান্তা দেওয়া হলে তা না খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান শামীম। এ সময় এক গ্লাস পানি পান করেন শুধু। বিকালে বাসায় ফিরে ভেতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ পান। পরে জানালা দিয়ে সন্তানদের গলা কাটা লাশ ও স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান শামীম।

আরেকজন প্রতিবেশী এই প্রতিবেদককে জানান, গত দেড় বছরের মধ্যে শামীম ও আনিকার স্বজনরা তাদের বাসায় বেড়াতে আসেন। শিশু দুটি সবসময় অন্য ভাড়াটিয়াদের সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। খুবই চঞ্চল প্রকৃতির ছিল।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকালে আনিকা আক্তার এবং তার দুুই সন্তান শামীমা ও আব্দুল্লাহর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুদের লাশ গলা কাটা অবস্থায় বিছানায় শোয়ানো ছিল। আনিকাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে