x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

ভোটের কাছে ভ্যাটের পরাজয়

  নিজস্ব প্রতিবেদক

২৯ জুন ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৯ জুন ২০১৭, ১৬:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেষ পর্যন্ত ভোটের জয় হলো; পিছিয়ে গেল ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, কমানো হলো আবগারি শুল্ক। আসন্ন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে কর সংক্রান্ত কয়েকটি সংশোধনী এনে গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০১৭ পাস হয়েছে।

সামনে নির্বাচন। এ অবস্থায় জনগণের ওপর বেশি কর আরোপ করা যাবে না। এই বিবেচনা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য নীতিনির্ধারকের চাপে অর্থমন্ত্রী পিছু হটেছেন। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন দুবছর পিছিয়ে দিয়েছেন। এ দুই বছর আগের ভ্যাট আইনই চালু থাকবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের হিসাবে জমার ওপর আবগারি শুল্কের হার কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। এই হার বর্তমানে বহালের চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে বেশি কমালেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য এই কর বেশি কমানো হয়েছে। তবে বড়দের ক্ষেত্রে কমানো হয়নি। ফলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জমার ওপর কোনো ধরনের আবগারি শুল্ক থাকছে না। একই সঙ্গে এক লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক দিতে হবে ১৫০ টাকা। তবে বড় গ্রাহকদের প্রস্তাবিত হারেই আবগারি শুল্ক দিতে হবে।

এদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এবারই প্রথম বাজেটে মৌলিক পরিবর্তন আনা হলো। এর আগে কখনো বাজেট ঘোষণার পর পাসের আগে এত বড় পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে এবারের বাজেটের মৌলিক কাঠামো আর থাকল না। তারা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা হওয়া উচিত নয়।

ব্যবসায়ীরা বাজেটের পরিবর্তনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে যেভাবে ভ্যাট বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেই সক্ষমতা কারো ছিল না। এখন দুবছর সময় পাওয়াতে সব পক্ষেরই ভালো হয়েছে। প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।

সরকারি দল আওয়ামী লীগ বাজেটের পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, এ পরিবর্তনের ফলে জনগণ উপকৃত হবে। আওয়ামী লীগ সব সময় জনগণের জন্য কাজ করে।

দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি গতকাল বাজেট বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে তারা আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে।

গত ১ জুন প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ও ব্যাংকে গ্রাহকদের জমার ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর ফলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় সব খাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। ব্যাংকে গ্রাহকদের জমার ওপর আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়। সমালোচনার মুখে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়গুলো বাজেট পাসের আগে সংশোধন করার আশ্বাস দিলেও অর্থমন্ত্রী ছিলেন অনঢ়। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের চাপে অর্থমন্ত্রীও ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া ও আবগারি শুল্ক কমানোর পক্ষে অবস্থান নেন।

এসব কারণে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেটে কর সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সংশোধনী এনে গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০১৭ পাস করিয়ে নেন। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, তিনি এর সবই করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায়।

নতুন অর্থবিল অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে সবুজ কারখানার ক্ষেত্রে আয়কর হার ১০ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ খাতের উদ্যোক্তারা আরও কর ছাড় পেলেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব কিছুই করা হয়েছে আগামী বছরের শেষে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে লক্ষ রেখে। কারণ নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাবে। এতে জন-অসন্তোষ বাড়বে। ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে যাবে। এ জন্য ব্যবসায়ীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিও ছিলেন এর সমালোচনায় মুখর। বিরোধিতা এসেছে শাসক দলের সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেও। সংশ্লিষ্টরা বাজেটের এ পরিবর্তনকে বলছেন, ভোটের কাছে ভ্যাটের পরাজয়।

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কর আরোপ প্রক্রিয়ায় মূল্য সংযোজন কর একটি উত্তম পন্থা এ কথা আমি আগেই বলেছি। ১৯৯১ সালে প্রণীত মূল্য সংযোজন কর আইনটি বহু সংশোধনীর পর অফলপ্রসূ হয়ে পড়ায় ২০০৮ সালেই একটি নতুন মূসক আইন প্রণীত হয়। এটি নিয়ে প্রায় চার বছর আমরা নানা আলোচনা বিতর্ক চালিয়ে যাই। অবশেষে ২০১২ সালে আমরা নতুন আইন প্রণয়ণ করি, যা এই মহান সংসদে পাস হয়। আইনটির কার্যকারিতা কিন্তু ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। এ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিধায় এ বারের বাজেটে আইনটি কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ বিষয়ে মাননীয় সংসদ সদস্যগণ তাদের প্রাজ্ঞ মতামত দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এই প্রেক্ষিতে আমি মূসক আইনের পূর্ণ কার্যকারিতা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করছি। আগের ধারাবাহিকতায় কিছু সংশোধন করে ২০১২ সালের আইনই যেভাবে গত চার বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে আমাদের বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ এই ঘোষণার মাধ্যমে নতুন মূসক আইন এখন আর বাস্তবায়ন করা হবে না।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে আরও একটি বাজেট দেওয়ার সুযোগ পাবে বর্তমান সরকার। কিন্তু ওই বাজেটেও নতুন মূসক আইনটি বাস্তবায়নে যাবে না সরকার। তাদের লক্ষ্য জনতুষ্টি। নতুন ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়ন করলে জনভোগান্তির সৃষ্টি হবে। সে জন্যই সরকার নতুন ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছে। এই অবস্থায় নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আগামীতে আসা সরকারের ওপর পড়বে।

এদিকে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের জন্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সরকারকে নানাভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। ভোটের দিকে দৃষ্টি রেখে সরকার তাদের সেই চাপ উপেক্ষা করেছে।

এ ছাড়া গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্কের হার কমানো হয়েছে। চাল আমদানিতে শুল্ক হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। দেশীয় শিল্পের স্বার্থে বিভিন্ন আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো-কমানো হয়েছে।

বেশ কিছু পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি কিংবা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনো কোনো পণ্যে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানো হয়েছে।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটির পর গতকাল বিকাল চারটায় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং তারপরই বাজেট বিষয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বাজেট নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে সেসব বিষয়ের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাবে। আমরা দেশের উন্নয়নে কাজ করছি। ব্যক্তিগত উন্নয়ন করছি না। জনগণের জন্য বাজেটের কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করছি। আশা করি অর্থমন্ত্রী এগুলো বিবেচনা করবেন।

এরপর অর্থমন্ত্রী বাজেটের সমাপনী বক্তৃতায় প্রস্তাবিত বাজেটের সংশোধনীগুলো উপস্থাপন করেন। অর্থমন্ত্রী আগামী দিনের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে বলেন, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি অর্জনের বিষয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। ২০১৫-১৬ সালে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর বিপরীতে বিবিএসের সাময়িক হিসাবে আমাদের প্রবৃদ্ধি এসেছে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। আমরা বিগত দুবছর ধরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছি। এ ধারা সামনের দিনগুলোতে অব্যাহত থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

অর্থমন্ত্রীর সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপনের পর সংসদে প্রস্তাবিত অর্থ আইন-২০১৭ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, জনভোগান্তির দিকগুলো দূর করে জনবান্ধব করে অর্থবিল পাস করা হয়েছে। ফলে পাস হওয়া অর্থ আইনটি অর্থমন্ত্রীর জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট বলে অভিহিত করেন মুহিত।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে