গোপালগঞ্জে রেহানা রংপুরে জয়

  আলী আসিফ শাওন ও কামরুল হাসান জুয়েল

০৭ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৭, ১৫:২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে দেখা যেতে পারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জ থেকে শেখ রেহানা এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি রংপুর থেকে নির্বাচন করতে পারেন জয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও আগামী নির্বাচনে এ দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি এখনো প্রাথমিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ।

সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই চান শেখ রেহানা ও সজীব ওয়াজেদ জয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করুক। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে সচেতনভাবেই রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন শেখ রেহানা। বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন পারিবারিক কর্মসূচিতে অংশ নিলেও রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন সব সময়। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের হয়ে সক্রিয় আছেন। তবে তিনি পর্দার আড়ালে থেকেছেন, প্রকাশ্য রাজনীতিতে তেমন একটা সরব হননি। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু পরিবারের এ দুই প্রভাবশালী সদস্যকে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেখতে চান।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে শেখ রেহানা ও রংপুর-৬ থেকে সজীব ওয়াজেদ জয় নৌকার কা-ারি হতে পারেন আগামী সংসদ নির্বাচনে। সে ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য লে. কর্নেল (অব) ফারুক খান রাজধানী ঢাকার গুলশান, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেন। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ইতিপূর্বে সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনের সময় ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কমিটিও হয়েছে ফারুক খানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই মনে করেন, আগামীতে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বসবাস করা সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফারুক খান।

অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্বাচনী এলাকা রংপুরের পীরগঞ্জ একসময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই আসনে নির্বাচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। চলতি সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ছেড়ে দেওয়া এই আসনটিতে নির্বাচন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। তবে সজীব ওয়াজেদ জয় রংপুর-৬ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে স্পিকার ফিরে যাবেন নোয়াখালী জেলায় নিজ নির্বাচনী এলাকায়।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও কেউ কোনো মন্তব্য করতে চাননি। প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক ব্যাপার বলে এ ব্যাপারে মন্তব্য না করে প্রত্যেক নেতাই পাশ কাটিয়ে গেছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক আমাদের সময়কে বলেন, আমরা চাই আওয়ামী লীগের আগামী প্রজন্ম নেতৃত্বে আসুক। সজীব ওয়াজেদ জয় ইতোমধ্যে তার মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আইসিটি সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। আমরা আশা করব, সব ক্ষেত্রে তার ভূমিকার মাধ্যমে এই উন্নতির ধারা অব্যাহত থাক।

বঙ্গবন্ধুর কণিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা বরাবরই রাজনীতিবিমুখ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকা-ের পর থেকে সব সময় বড় বোন শেখ হাসিনার পাশে থাকলেও তিনি প্রকাশ্যে কখনো রাজনীতির ময়দানে আসেননি। এবারই প্রথম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে উপদেষ্টা হিসেবে রাজনৈতিক কোনো পদে দেখা গেছে শেখ রেহানাকে। গত ১৭ জুলাই টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। শেখ রেহানাকে ওই কমিটির উপদেষ্টাম-লীর ৩ নম্বর সদস্য করা হয় বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ইলিয়াস হক। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৫৭ জনকে কার্যনির্বাহী কমিটিতে ও ১৪ জনকে উপদেষ্টাম-লীর সদস্য করা হয়।

গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খান আমাদের সময়কে জানান, শেখ রেহানাকে জেলা কমিটির উপদেষ্টা পরিষদে রাখার ইচ্ছা আছে তাদের। কিছু দিনের মধ্যেই গোপালগঞ্জ জেলা কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন হবে বলেও জানান তিনি। কাশিয়ানী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোক্তার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, শেখ রেহানা গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে এবার নির্বাচন করতে পারেন, এমনটি শুনেছি। কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি।

এদিকে রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তার জন্মভূমি পীরগঞ্জের মানুষ। পীরগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে তার আপন জ্যাঠাতো ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ মো. তাজিমুল ইসলাম শামীম বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় সাড়া পড়েছে পীরগঞ্জসহ পুরো জেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। তারা চাইছেন, আগামীতে জাতীয় সংসদে জন্মভূমি পীরগঞ্জের প্রতিনিধি হিসেবেই জয় তার কাজ শুরু করুন। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা ও জয়ের ছবিসংবলিত পোস্টার-ব্যানার আর প্ল্যাকার্ডে ভরে গেছে পীরগঞ্জের সর্বত্র; চলছে নানা গুঞ্জন আর প্রত্যাশাপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ।

একসময়ের লাঙ্গলভক্ত উপজেলা সদরের চা বিক্রেতা পবিত্র কুমার বলেন, ‘জয় ভোটোত দাঁড়ালে হামরা ভোট দেমো, পীরগঞ্জোত আর নাঙ্গলের খাওয়া নাই।’

রিকশাচালক আজাদ আলী বলেন, ‘হামরা চাই সামনের ভোটোত জয় দাঁড়াক, জয় হলি এলাকার অনেক কাজ হবি।’

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে, ২০১৩ সালের ৩১ জুলাই পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় মা শেখ হাসিনার সঙ্গে স্ত্রী ক্রিস্টিনাসহ যোগ দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। জীবনের প্রথম জনসভায় পীরগঞ্জবাসীর উদ্দেশে তিনি সেখানকার আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেনÑ ‘মুই ফির আসিম, বারবার আসিম, তোমরা মোর জন্যে দোয়া করেন, মুই এই মাটির সন্তান।’ পীরগঞ্জের মানুষকে নিয়ে জয়ের ভাবনার বহির্প্রকাশ সেদিনই বুঝেছিল এলাকার মানুষ। পরবর্তী সময়ে মায়ের জন্য ভোট চাইতে আবার পীরগঞ্জে গিয়েছিলেন জয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর তরফমৌজা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেনÑ নির্বাচনের পর জয়কে আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেব। সে এসে আপনাদের খোঁজখবর রাখবে। ওই নির্বাচনের আগে ২ জানুয়ারি মায়ের জন্য ভোট চাইতে দুদিনের সফরে পীরগঞ্জে গিয়ে জয় তিনটি পথসভাসহ দাদাবাড়ি ফতেহপুরে এক কর্মিসভায় বক্তৃতা করেন। এর পর একই বছরের ১৬ মার্চ আবার পীরগঞ্জে যান জয়। ফতেহপুরের নিজ বাসভবন জয়সদনে রাতযাপন শেষে ১৭ মার্চ সকালে শত শত নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে নানার জন্মদিন পালন করে কর্মিসভায় যোগ দেন। সেই সময় পীরগঞ্জের উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘পীরগঞ্জের জন্য আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করব’।

২০১৪ সালের ১২ জুলাই সজীব ওয়াজেদ জয় প্রথম পীরগঞ্জে উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের উদ্বোধন করেন। সেদিন তিনি পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাবেশস্থল থেকে সুইচ টিপে পীরগঞ্জের ৫০টি গ্রামের ৩ হাজার ২৪ পরিবারের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর আগে তিনি কছিমন নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহিলা ডিগ্রি কলেজে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ আরও তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াইফাই সংযোগের উদ্বোধন করেন। বিশাল জনসভায় পীরগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে রংপুরে গ্যাস সংযোগ, টেক্সটাইল কলেজ ও শিল্পকারখানা স্থাপন, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পীরগঞ্জের দাবি ও চাহিদা আমারও দাবি।’ সেই সময় জয় স্পষ্টতই বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে রাজনীতিতে এলে পীরগঞ্জ থেকেই আমি নির্বাচন করব।’

পীরগঞ্জে গিয়ে জয় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে পীরগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ শেষ পর্যায়ে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে ড. ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল কলেজ, পুষ্টি ইনস্টিটিউট, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও মেরিন একাডেমির নির্মাণকাজ।

এ ব্যাপারে কথা হলে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রংপুরবাসীর ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন তাকে (জয়) নিয়েই। আমাদের প্রিয় নেত্রী যে ভিশন-২০২১ ঘোষণা করেছেন, তা পূর্ণতা পাবে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে। তিনিই হবেন আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধার।

রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জয়ের জ্যাঠাতো ভাই একেএম ছায়াদৎ হোসেন বকুল বলেন, আমরা আগামীতে জয়কেই এ আসনের প্রার্থী হিসেবে পাব। সে প্রত্যাশায় ও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।

পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান রাঙ্গা বলেন, জয় পীরগঞ্জের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। পীরগঞ্জের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার বহির্প্রকাশ ঘটেছে এ অঞ্চলে বিভিন্ন রকম উন্নয়নের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে। আগামী নির্বাচনে জয় এ আসন থেকেই প্রার্থী হবেন ইনশাআল্লাহ।

পীরগঞ্জ পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ মো. তাজিমুল ইসলাম শামীম বলেন, পীরগঞ্জবাসী আগামী নির্বাচনে জয়কেই চান। সেটি সাম্প্রতিককালে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে তা তারা প্রমাণ করেছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে