১২ কোটির সরকারি কারখানা দেড় কোটি টাকায় বিক্রি

প্রকাশ | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:১৩

রুমানা রাখি

১২ কোটি টাকা মূল্যের একটি সরকারি কারখানা বিক্রি হয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকায়। ১৮ বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয় জমিটি মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে বিক্রির ১০ বছর পর। কিন্তু নিয়ম না মেনে বিক্রির কারণে এখনো ঝুলে আছে জমিটির রেজিস্ট্রেশন। অথচ রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই সেই জমিতে গার্মেন্টস কারখানা খুলে বসেছে নতুন মালিকপক্ষ। পাশাপাশি ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে জনতা ব্যাংকের কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছে ঋণ। বর্তমানে সেই ঋণের বিপরীতে দায়ের করা মামলা ঝুলছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য, জমিটি চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট শিল্প এলাকায় অবস্থিত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাধীনতার পরপরই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় দোসা এক্সট্রাকশন লিমিটেড নামের সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীকালে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার পর পুঁজি প্রত্যাহার নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এনএ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই সময় ক্রেতাপক্ষ বিক্রয় চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করায় এবং মূল্য পরিশোধ না করায় সরকার আবার প্রতিষ্ঠানটির দখল নেয়। এর পর প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড থেকে ১৯৯৭ সালের ২৫ জানুয়ারি টেন্ডারের মাধ্যমে মাত্র এক কোটি ৩০ লাখ টাকায় হাজী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও এমএ কাদের নামের দুই ব্যক্তির কাছে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করার ইচ্ছাপত্র জারি করে শিল্প মন্ত্রণালয়। এর প্রায় ১০ বছর পর অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১৪ জুন জমিটির চুক্তিনামা সম্পাদিত হলেও ক্রেতারা জমিটির দখল পাননি। জমি হস্তান্তরের আগে জানা যায়, সরকারি এ জমির বিপরীতে জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অগ্রণী ব্যাংকের টাকা পাওনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) দেওয়া তথ্যমতে, চউক নিয়ন্ত্রিত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকায় জমির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্য তালিকায় ফৌজদারহাট শিল্প এলাকার প্রতিকাঠা জমির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয় ১০ লাখ টাকা। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০০০ সালের ১১ মে করা হিসাবে দোসা এক্সট্রাকশন লিমিটেডের অনুকূলে ইজারাকৃত ১২১ কাঠা জমির মূল্য ধরা হয় ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই সঙ্গে এ টাকার ১৫ শতাংশ হস্তান্তর ফি হিসাবে আরও ১ কেটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।

চউক আরও জানায়, এর আগে ওই এলাকার প্লটে স্থাপনা না থাকায় কাঠাপ্রতি অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার টাকা হিসাবে মোট ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হস্তান্তর ফি আরোপযোগ্য। আর এ ফি না দিয়ে কোনোভাবেই জমির রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব নয়।

গত ২৪ অক্টোবর শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে জনতা ব্যাংক থেকে দাবিকৃত পাওনা পরিশোধের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১২ সালের ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত একটি সভার কার্যবিবরণী দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।

এদিকে জনতা ব্যাংক থেকে জানানো হয়, ২০১১ সালের ৩১ তারিখ পর্যন্ত করা হিসাবে মেসার্স দোসা এক্সট্রাকশন লিমিটেডের কাছে জনতা ব্যাংক চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখার পাওনা ২০ লাখ ৩০ হাজার ৮৩৬ টাকা।

বকেয়া থাকার পরও কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিক্রি হলো?Ñ জানতে চাইলে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে জনতা ব্যাংকের যে পাওনা, তা ক্রেতাপক্ষের ওপর বর্তাবে না। কারণ হস্তান্তরের আগে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও দায়-দেনার পরিমাণ নিরূপণের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সব কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি ইনভেন্টরি কমিটি গঠন করা হয়। সেই সময় কমিটির প্রতিবেদনে দায়দেনার বিবরণে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির কাছে জনতা ব্যাংক লালদীঘি শাখার ৩ লাখ ৫২ হাজার টাক পাওনা রয়েছে। যদিও ইনভেন্টরি প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, প্রতিষ্ঠানটির কোনো চলতি সম্পদ নেই। আর এ কারণে ক্রেতাকে কোনো ধরনের অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি। তবে এ টাকা নীতিমালা অনুযায়ী সরকার কর্তৃক পরিশোধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তহবিল বা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ নিয়ে এ ঋণ শোধ করতে হবে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অসহযোগিতার কারণেই প্রতিষ্ঠানটির বেসরকারিকরণ কার্যক্রম এভাবে ঝুলে আছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বেসরকারিকরণ আইন-২০০০ সংশোধন এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের কার্যক্রম শক্তিশালী করতে সরকার উদ্যোগী হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও আমলাদের বেসরকারিকরণ নীতির বিপক্ষে অবস্থানের কারণে এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কমিশনের একটি সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান যখন বেসরকারিকরণের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়, তখন পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয় না কিংবা তথ্য গোপন করা হয়। ফলে সীমিত তথ্য নিয়েই কমিশনকে কাজ করতে হয় এবং এ কারণে প্রায়ই শেষ সময়ে ঝামেলা বাধে। এ ছাড়া জমির পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণ, ইজারা নবায়ন, মামলাজনিত জটিলতা এবং ঋণ পরিশোধ না করার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক নিলাম আহ্বানÑ ইত্যাদি কারণে প্রচুর সময় ব্যয় হয়।

কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, ১৯৯৩ সালে বেসরকারিকরণ বোর্ড গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৭টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরে করা হয়েছে ৪টি। আর রিট মামলার কারণে ঝুলে আছে ৭টি। এর মধ্যে একটি দোসা এক্সট্রাকশন লিমিটেড।

এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানজিনা ইসলাম বলেন, নিয়ম মেনেই কারখানাটি বিক্রি করেছে মন্ত্রণালয়। যদিও কারখানাটি নিয়ে এখনো মামলা চলছে। তাই মালিকদের কাছে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে চউকের সিনিয়র এস্টেট অফিসার চৌধুরী মোহাম্মদ আবু হেনা মঞ্জু বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করা এবং রেজিস্ট্রেশনের আগে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তাই সিডিআই থেকে দেখা গেছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা মূল্যের জমিটি বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। যতক্ষণ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এর দাম বাড়তে থাকবে। বর্তমান বাজারে এ জমির মূল্য অনেক।

এ বিষয়ে জমিটির মালিকদ্বয়ের একজন হাজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, আমরা সরকারি জমি কিনেছি। জমিটি যখন কিনেছি, তখন এর দর বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি ছিল। কেনার পর থেকেই জমিটি নিয়ে জটিলতা ও মামলা চলছে। তাই এখনো জমিটির রেজিস্ট্রেশন করা হয়নি। তবে জমিতে আমাদের একটি গার্মেন্টস এক্সেসরিজ কারখানা রয়েছে।

চউকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, বিক্রির আগে কার কত টাকা পাওনা, তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা হয়নি। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমাদের কেন রেজিস্ট্রেশন করতে দিচ্ছে না, তাও জানা নেই। তাই আমরা শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছি রেজিস্ট্রেশনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে।