মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস প্রতারণা

অভিভাবকের অনৈতিকতার বলি ৩৫ শিক্ষার্থী

  হাবিব রহমান

১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করেছেন। সবার চোখেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। প্রস্তুতি নিতে থাকেন তীব্র ভর্তিযুদ্ধের জন্য। কিন্তু বাবা-মা হয়তো তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। সন্তানদের স্বপ্নকে সত্যি করতে তারা বেছে নেন ভুল পথ। আশ্রয় নেন অনৈতিকতার। তার মাসুল দিতে হচ্ছে ৩৫ শিক্ষার্থীকে। তারা পরীক্ষায় অংশ নিলেও রোল নম্বরগুলো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পেতে অর্থ দিয়ে চুক্তি করেন ৩৫ শিক্ষার্থীর অভিভাবক। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু শেষ মুহূর্র্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতারক চক্র র্যাবের হাতে আটক হয়। এর মাধ্যমে বেরিয়ে পড়ে থলের বিড়াল।

সন্তানকে চিকিৎসক অথবা পছন্দের বিষয়ে পড়াতে অভিভাবকদের এমন অনৈতিক চর্চার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবারে সুনীতির চর্চা কমেছে। কিছু অভিভাবকের চাওয়াটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা যে কোনো মূল্যে সন্তানের পছন্দের বিষয়ে পড়াতে চান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, এটি খুবই বেদনাদায়ক। শুধু মেডিক্যাল কলেজ নয়, অন্য পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গেও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে আমাদের সমাজ ক্রমাগত সুনীতির চর্চা থেকে বেরিয়ে আসছে। পরিবারগুলোর ভেতরে এক সময় সুনীতির চর্চা ছিল। নীতিশিক্ষা সন্তানরা পরিবার থেকেই পেত। পরিবারগুলো তাদের বস্তুগত উন্নতির জন্য অর্থাৎ সন্তান উচ্চশিক্ষা পাবে ভালো চাকরি পাবে তার জন্য সাধনা করত।

তিনি বলেন, প্রথমত. আমাদের নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে। দ্বিতীয়ত. সন্তান কতটা মানবিক হলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় জাগতিক মোহ। প্রশ্নফাঁসে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মিলে নকলের বাজার তৈরি করেছেন। কারণ এর চাহিদা আছে। র্যাবের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধ বিষয়ক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক সেল থাকা দরকার।

গত ৬ অক্টোবর ২০১৭-১৮ সালের এমবিবিএস/বিডিএস ১ম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দিন ধার্য ছিল। পরীক্ষার আগেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে, একটি প্রতারক চক্র মোবাইল ফোন, ইমু, এসএমএস, ই-মেইলের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগে র্যাব ৩-এর একটি দল কলাবাগান থানা এলাকার একটি বাড়ি থেকে চক্রের অন্যতম হোতা সহকারী কর কর্মকর্তা দীপংকর চন্দ্র সরকারকে গ্রেপ্তার করে। এর পর দিন র্যাব ১০-এর একটি দল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সোলায়মান হোসেন মেহেদী, সাবিনা ইয়াসমিন মিলি ওরফে তিন্নি ও বনানীর একটি ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. বারেকসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারকৃত চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের ব্যাংক চেক। ভর্তি পরীক্ষার পরই এসব চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের কথা ছিল। এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের ব্যাংক চেক জব্দ করা হয়।

এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাদের সময়কে বলেন, মেডিক্যাল ভর্তিচ্ছু প্রায় সবারই ফল ভালো থাকে। এই ৩৫ জনের মধ্যে হয়তো কারো কারো চান্স পাওয়ার সুযোগ মিলত স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিয়েই। কিন্তু পরীক্ষার আগে অভিযানের কারণে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছিল তাতে কেউই ঠিকভাবে পরীক্ষাও দিতে পারেননি। তবে দুজন অভিভাবকের সঙ্গে এই চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।

র্যাব জানায়, মূলত চেকগুলো দিয়েছিলেন অভিভাবকরাই। কারণ প্রত্যেক শিক্ষার্থী ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার ব্যাংক চেক পর্যন্ত দিয়েছিল চক্রটির হাতে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উচ্চ মাধ্যমিক পাস একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। অভিভাবকরাই এসব অর্থের চেক দেন। অনেক অভিভাবক নিজেই প্রশ্নফাঁস প্রতারক চক্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

ভর্তি পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে র্যাবের জালে ধরা পড়ে চক্রের মূল হোতা। সঙ্গে সঙ্গে জব্দকৃত সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র এবং চুক্তিবদ্ধ ৩৫ শিক্ষার্থীর রোল নম্বর পাঠানো হয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মেলেনি জব্দকৃত প্রশ্নপত্র।

এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আমাদের সময়কে বলেন, অভিভাবকদের বেপরোয়া চাওয়ার কারণে এমনটা ঘটে। এ ক্ষেত্রে নৈতিকতার চর্চাটা জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে