ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাঙ্গামাটির পর্যটন

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙ্গামাটি

১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০০:৪৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা শেষে আগমন ঘটেছে শরতের মিষ্টিমাখা আমেজ। উঁকি দিচ্ছে শীতও। ধীরে ধীরে কমছে উষ্ণতার তেজ। কখনো কখনো দোলা দিয়ে যাচ্ছে মৃদু-মন্দ হিমেল হাওয়া। অরণ্য, পাহাড়, ঝরনা আর হ্রদের শহর রাঙ্গামাটি এখন পুরোদমে প্রস্তুত পর্যটকদের বরণ করে নিতে।

ভয়াবহ পাহাড়ধসের বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে রাঙ্গামাটির পর্যটন ব্যবসা। মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকের আগমন ঘটছে উল্লেখযোগ্যহারে। পর্যটকদের আগমন ঘিরে নিরাপদ ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে পর্যটন ব্যবসাসংশ্লিষ্টরাও। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের নেওয়া সোয়া ১২শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের গ-ি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়াবে পর্যটনের রূপ।

চলতি বছরের ১৩ জুনের স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে পাঁচ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ও ১৩ শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে গত প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে পর্যটন ব্যবসায় মারাত্মক মন্দা দেখা দেয়। রাঙ্গামাটি চেম্বারের হিসাবে, এ সময় জেলায় পর্যটনের পাঁচটি খাতে দিনে গড়ে অন্তত ৩০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। খরচ কমাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষত এখন শুকাতে শুরু করেছে। চাঙ্গা হতে শুরু করেছে পর্যটন ব্যবসা।

প্রতিনিয়ত হাজার হাজার পর্যটক যান্ত্রিক শহুরে ক্লান্তি দূর করতে ছুটে আসেন রাঙ্গামাটি। বিনোদনের খোঁজে পাহাড়ে আসা পর্যটকদের আনন্দ আর উচ্ছ্বলতা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ভুলিয়ে দিচ্ছে জীবনের নানা জটিলতা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় থাকে। শহরের পর্যটন স্পট ঝুলন্ত সেতু, সুভলং ঝরনা, পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স, সুখী নীলগঞ্জ এবং রাজবন বিহার এলাকায় প্রতিনিয়ত ভিড় জমান পর্যটকরা।

রাঙ্গামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা জানান, গত কয়েকদিন ধরে পর্যটকের আগমন শুরু হয়েছে। বর্তমানে পর্যটন মোটেলের কক্ষগুলো প্রায় সময় শতভাগ বুকিং থাকছে। ছুটির দিনে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাঙ্গামাটি। ঝুলন্ত সেতু এখনো প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে। তবুও পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন না। শুক্র-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনে গড়ে সহস্রাধিক পর্যটক আসছেন।

শহরের দোয়েল চত্বরের আবাসিক হোটেল ‘প্রিন্স’-এর মালিক মো. নেছার আহম্মেদ জানান, পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রায় চার মাস রাঙ্গামাটি ছিল পর্যটকশূন্য। কিন্তু এখন পর্যটক আসা শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে হোটেলে পর্যটকরা অগ্রিম বুকিং দেওয়া শুরু করেছেন।

ঝুলন্ত সেতু এলাকায় কথা হয় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মনিরুল ইসলাম রাজু ও নাহিদা ফেরদৌস কলি দম্পতির সঙ্গে। তারা কিছুটা হতাশ ঝুলন্ত সেতুতে উঠতে না পেরে। বলেন, পানি সরে গেলে আবারও আসব। বারবার রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসি অফিস বন্ধ পেলেই।

বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অপু রায়হান হৃদয় বলেন, রাঙ্গামাটি পর্যটনের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় অঞ্চল। এখানে সবুজ অরণ্য, পাহাড়, হ্রদ আর ঝরনার সমন্বয়ে গড়া প্রকৃতি যে কাউকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনার অভাবে পর্যটনের দিক থেকে রাঙ্গামাটি এখনো পিছিয়ে। এখানকার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগালে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন করা যাবেÑ বলেন তিনি।

রাঙ্গামাটি শহরে বেসরকারি ৪২টি হোটেল-মোটেল রয়েছে। প্রতিদিন তিন হাজার অতিথি হোটেল-মোটেলে থাকতে পারেন। পর্যটকদের সেবা দিতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে চার শতাধিক। হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট (খাবারের দোকান), টেক্সটাইল (পাহাড়িদের তৈরি কাপড়), নৌযান এবং বিনোদন কেন্দ্রকে (ঝুলন্ত সেতুসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান) ঘিরেই মূলত রাঙ্গামাটির পর্যটন খাত। রাঙ্গামাটি চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া পর্যটন ব্যবসায় ক্ষতির পরিমাণ হিসাব কষে বলেন, জরিপ করে দেখেছি, শুধু এ পাঁচ খাতে গড়ে দৈনিক কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

বেসরকারি হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নছার আহমেদ বলেন, মৌসুমের শুরুতেই পর্যটকদের আগমন ঘটছে। আশা করছি গত চার মাসের লোকসান কমিয়ে আনতে পারব। শহরের হোটেল সুফিয়া কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক মো. সোহেল হাওলাদার বলেন, পর্যটকরা অগ্রিম বুকিং দেওয়া শুরু করেছেন। প্রতিদিনই পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ছে চোখে পড়ার মতো।

রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘ্যরে ঝুলন্ত সেতু। তাই পর্যটকরা প্রথমেই ছুটে যান পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকায়। বছরে প্রায় দুই লাখ দেশি ও বিদেশি পর্যটক সেতুটি দেখতে আসেন। পর্যটন কমপ্লেক্সের অধীন দুটি হোটেল-মোটেল, ছয়টি কটেজ এবং ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। এসব হোটেল-মোটেলে ৮৬টি কক্ষ রয়েছে।

এ ছাড়া এখানে নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে মিলবে পছন্দের নৌযানও। পর্যটন কমপ্লেক্স নৌযান ঘাটের ব্যবস্থাপক মো. রমজান আলী বলেন, পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য ঘাটে স্পিডবোটসহ বিভিন্ন ধরনের ৯৫টি নৌযান রয়েছে। নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে এসব নৌযানে ভ্রমণ করতে পারেন পর্যটকরা।

ইতোমধ্যেই রাঙ্গামাটির পর্যটনকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব পেয়েই পর্যটন উন্নয়নে সোয়া ১২শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছেন বলে জানান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা। তিনি বলেন, পাহাড়, হ্রদ আর অসংখ্য ঝরনাবেষ্টিত রাঙ্গামাটি দেশের পর্যটন খাতে অত্যন্ত ভালো অবস্থানে রয়েছে। আগামীতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য সেরা স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলে আগামী বছর প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে