ইনুকে নিয়ে আওয়ামী লীগে চরম ক্ষোভ বিএনপিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী

  শামসুল আলম স্বপন, কুষ্টিয়া

২০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৭, ০১:১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক সময়ের চরমপন্থি-সন্ত্রাসী অধ্যুষিত মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে কুষ্টিয়া-২ আসন। ক্ষমতাসীন জোটের দুই হেভিওয়েট নেতা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আহসান হাবীব লিংকনের বাড়ি এই এলাকায় পাশাপাশি ইউনিয়নে। এ কারণে আসনটি জেলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সাংসদ হাসানুল হক ইনু। জোটের স্বার্থে ২০০৮ সালের নির্বাচনে হানিফকে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল ইনুকে। নৌকা প্রতীকে অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন ইনু। তবে ইনুকে মনোনয়ন দেওয়ায় আওয়ামী লীগে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। ইনুর মনোনয়ন বাতিল করা না হলে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা পদত্যাগের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। নির্বাচনের পর হানিফকে পুরস্কারস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী করা হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে ইনু পুনরায় এমপি হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। হানিফ-ইনুর ঠা-া লড়াইয়ে চরম প্রভাব পড়েছে মিরপুর ও ভেড়ামারার রাজনীতিতে। দুই দলের বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে দুই দলে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে গত এক বছরে প্রাণ হারিয়েছে উভয় দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। দল দুুটির অফিসে হয়েছে পাল্টাপাল্টি হামলা। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবার আর ইনুকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবে না বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে ইনুর বিপক্ষে মাহবুব-উল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিনকে প্রার্থী করার জোরালো দাবি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, দেশ স্বাধীনের পর থেকে জাসদ গণবাহিনীর হাতে দলের বহু নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছে। বর্তমানে বিএনপি থেকে সন্ত্রাসীরা জাসদে যোগদান করে আবারও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রক্ত ঝরাচ্ছে। মন্ত্রী হওয়ার পর ইনু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এ পর্যন্ত কোনো বৈঠক করেননি বলেও ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগে।

এসব কারণে যখন দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইনুর ওপর ক্ষেপে আছেন, ঠিক সে সময় ‘আমরা না থাকলে আওয়ামী লীগ পথে পথে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরত, এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখত না’Ñ এমন বক্তব্য দিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালেন তিনি। এহেন বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও ইনুর নাম উচ্চারণ করতে চাচ্ছেন না। পাশাপাশি ইনু যাতে আর নৌকায় চড়তে না পারেন, সে ব্যাপারেও হাইকমান্ডের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল আরেফিন কুষ্টিয়া-২ আসনে ভোটের হিসাব দিয়ে বলেন, এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৪ হাজারের মতো। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোট ৪০ শতাংশ, বিএনপির ভোট ৩০ শতাংশ, জামায়াতের ১৫ শতাংশ, জাসদের ১০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের ৫ শতাংশ। মাত্র ১০ শতাংশ ভোট নিয়ে জাসদ নেতার বড়াই করা কতটা উচিত হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনেই বোঝা যাবে। তিনি বলেন, ভেড়ামারা ও মিরপুরের উন্নয়নে ইনুর কৃতিত্ব নেই। ২০১০ সালে তৎকালীন এলজিআরডিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং মাহবুব-উল আলম হানিফ মিরপুরে বসে দুটি উপজেলার উন্নয়নের জন্য যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন, সেটিই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকেই প্রার্থী করতে হাইকমান্ডের কাছে প্রস্তাব করা হবে বলেও জানান তিনি।

তবে জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম স্বপন বলেন, বিএনপির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হলে ১৪-দলীয় জোটগতভাবেই নির্বাচন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা বিকল্প চিন্তাভাবনা করবে, তারা বিএনপির দোসর জামায়াতের পক্ষেই অবস্থান নেবে। যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগ করে, তারা নৌকার প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবে। ছোটখাটো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন এই নেতা।

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন করবে না বলে ঘোষণা দিলেও বসে নেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এক সময়ে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দলের নবীন-প্রবীণ তিন নেতা মাঠে নেমেছেন। জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) কেন্দ্রীয় নেতা আহসান হাবিব লিংকনও ২০-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। আছেন জামায়াতেরও শক্তিশালী প্রার্থী।

১৪-দলীয় জোট ঠিক থাকলে আগামী নির্বাচনে ইনুর মনোনয়ন পাকাপোক্ত বলেই মনে করেন জাসদের নেতাকর্মীরা। তিনি প্রতিমাসে নির্বাচনী এলাকায় এসে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তবে আগামী নির্বাচনে তার সামনে বড় বাধা স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

মূলত ইনুর কারণেই ভেড়ামারা উপজেলায় জাসদ শক্তিশালী। একই এলাকায় বাড়ি হানিফের। তার কারণে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও দাপট রয়েছে বেশ।

বিএনপি ছাড়াও ২০-দলীয় জোটের একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী মাঠে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করছেন। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ অধ্যাপক শহীদুল ইসলামের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নবীন নেতা ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়াও রয়েছেন ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন। ২০-দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আছেন জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) কেন্দ্রীয় নেতা আহসান হাবিব লিংকন ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা আবদুুল গফুর।

তিনবারের সাবেক সাংসদ অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, মিরপুর-ভেড়ামারার উন্নয়ন বলতে যা বোঝায়, সবই আমার সময়ে হয়েছে। শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ জনগণেরও ইচ্ছা আমি যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। জনমত যাচাই করে দল তাকেই মনোনয়ন দেবে বলে মনে করেন সাবেক এই এমপি।

ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী সরকারবিরোধী আন্দোলনে মামলার শিকার জেলার নেতাকর্মীদের হাইকোর্টে আগাম জামিনসহ সব মামলা বিনা খরচে চালাচ্ছেন। খালেদা জিয়ার একাধিক মামলাও তিনি দেখভাল করেন। দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগও ভালো। মিরপুর উপজেলার বাসিন্দা তিনি। এ উপজেলার ভোটার সংখ্যা ভেড়ামারার প্রায় দ্বিগুণ। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তার পিতা মরহুম আবদুর রউফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পশ্চিম জোনাল কাউন্সিলরের চেয়ারম্যান ও তিনবারের এমপি ছিলেন। ব্যারিস্টার রাগীব রউফ বলেন, নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব।

এ আসনে জামায়াতের অবস্থান বেশ শক্ত। এখানে নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে দলটির। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল গফুরকে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জেলা জামায়াত। ২০-দলীয় জোটের কাছে আসনটি দাবি করবে বলেও দলের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে