আওয়ামী লীগে কোন্দল সুযোগ নিতে চায় বিএনপি

  কাজল আর্য, টাঙ্গাইল

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেলা টাঙ্গাইল। একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে জেলার অন্যান্য নির্বাচনী এলাকার মতো টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) নির্বাচনী এলাকায়ও চলছে তৎপরতা।

নাগরপুরের ১২ ইউনিয়ন ও দেলদুয়ারে আট ইউনিয়ন নিয়ে এ আসনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা মাঠে কাজ শুরু করেছেন। তারা শুভেচ্ছাবিনিময় থেকে শুরু করে মতবিনিময় ও সভা-সমাবেশ করছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দলীয়প্রধানের ছবির সঙ্গে নিজের ছবিসংবলিত পোস্টার-ব্যানার টাঙিয়েছেন কেউ কেউ। এ পর্যন্ত বর্তমান ও সাবেক সাংসদসহ বেশ কিছু নতুন মুখ নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ করছেন। আবার অনেকে শুধু পরিচিতি লাভ কিংবা দলে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। মনোনয়ন প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে আছেন। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কিছুটা কোন্দলমুক্ত। আওয়ামী লীগের কোন্দলকে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি।

এ আসন থেকে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের সেতাব আলী মোক্তার। এর পর ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নূর মোহাম্মদ খান বিজয়ী হন। পরে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নূর মোহাম্মদ খান এরশাদের জাতীয় পার্টির হয়ে এমপি হন। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু তাহের আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাতীয় নেতা প্রয়াত আবদুল মান্নানকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও তিনি আবার এমপি হন। একই বছর ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ বিএনপির খন্দকার আবু তাহের ঋণখেলাপির দায়ে নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের (রব) গৌতম চক্রবর্তীকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ওই নির্বাচনে গৌতম চক্রবর্তী আওয়ামী লীগের প্রার্থী খন্দকার আবদুল বাতেনকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খন্দকার আবদুল বাতেনকে আবারও পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বার এমপি হন গৌতম চক্রবর্তী। ২০০১-০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দেলদুয়ার উপজেলাকে টাঙ্গাইল সদর আসন থেকে কেটে নাগরপুরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আবদুল বাতেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আহসানুল ইসলাম টিটু দ্বিতীয় এবং বিএনপির গৌতম চক্রবর্তী তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ী হন খন্দকার আবদুল বাতেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী খন্দকার আবদুল বাতেন। মুক্তিযুদ্ধের বাতেন বাহিনীপ্রধান এ রাজনীতিবিদ এক সময় জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে নানা কারণে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বেশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এ আসন থেকে এবার সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে এমপি হওয়ার ইচ্ছায় ব্যাপক গণসংযোগ ও উন্নয়নমূলক কাজ করছেন। আরেক শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আহসানুল ইসলাম টিটুর সঙ্গে দলের একাংশের যোগাযোগ রয়েছে। তিনিও গণসংযোগ করছেন। মূলত এ তিন মনোনয়নপ্রত্যাশীর পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক তারেক শামস খান হিমু, টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক ইনসাফ আলী ওসমানী, জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, নাগরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকিরুল ইসলাম উইলিয়ামও মনোনয়ন চাইতে পারেন। তারা প্রত্যেকেই এ আসন থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন প্রবীণ ও নবীন কয়েকজন নেতা। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত জাতীয় নির্বাহী কমিটির পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে আছেন।

এ ছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী নূর মোহাম্মদ খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রবিউল আওয়াল লাভলু, টাঙ্গাইল জেলা সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আরফান আলী মোল্লা ও অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ড. আমিনুল ইসলাম মঞ্জু, নাগরপুর উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন খান, কেন্দ্রীয় জাসাস নেতা শরিফুল ইসলাম স্বপন, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার সাদাত খান মনোনয়ন চাইতে পারেন। বিএনপির মধ্যে কোন্দল থাকলেও আওয়ামী লীগের মতো তীব্র নয়।

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) থেকে কেন্দ্রীয় নেতা সদস্য মামুনুর রহিম সুমন এবং ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে জাতীয় কৃষক সমিতির টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাসুকুল হক মুরাদ মনোনয়নপ্রত্যাশী ।

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম আমাদের সময়কে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চাই, চেষ্টাও করছি। টাঙ্গাইল-৬ আসনে থেকে আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আরও অনেকেই মনোনয়ন পাওয়ার আশায় কাজ করছেন। আমি বিশ^াস করি, দল যাকেই মনোনয়ন দেবে, শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য একাট্টা হয়ে তার পক্ষেই সবাই কাজ করবেন। মনোনয়নের ব্যাপারে দলীয় মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তই আমার শিরোধার্য।

গৌতম চক্রবর্তী আমাদের সময়কে বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি এবং দিচ্ছি। তাই মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী আমি। দেশের মানুষ একটি অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। সুষ্ঠুভাবে ভোটাররা তাদের ভোট দিতে পারলে আমি অবশ্যই বিজয়ী হব এবং বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে।

এলাকার অনেকের ধারণা, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির জন্য সুবিধার কারণ হতে পারে। আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া বিএনপি। তবে দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় জনগণ আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে আবার নির্বাচিত করবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

দেলদুয়ার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, এ আসনের দেলদুয়ার উপজেলায় ভোটার এক লাখ ৫৯ হাজার ৫১৩ জন এবং নাগরপুর উপজেলায় ভোটার দুই লাখ ২৫ হাজার ২৪১ জন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে