ভারতে টাকা পাচারে জড়িত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মচারীরা

  হারুন-অর-রশিদ

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৭:৪৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়াবা ও হিরোইন সেবনের উপকরণ হিসেবে বাংলাদেশের ২ ও ৫ টাকার নোট ভারতীয়দের কাছে অনেক জনপ্রিয়। এ জন্য এসব নোটের পাচারও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর এই ২ ও ৫ টাকার নোট ভারতে পাচার করছেন স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারী ও কয়েকজন সিবিএ নেতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে নতুন টাকা নিয়ে ভারতীয়দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা অফিসের কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) নেতা হুমায়ন কবীর মোল্লার বিরুদ্ধে। জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের নেতা হিসেবে দাপটের সঙ্গে এ রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করছেন তিনি। কীভাবে, কারা সীমান্তের ওপারে টাকা পাচার করছেন, সে বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে খুলনা অফিস। কিন্তু সেই তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করছেন হুমায়ন কবীর মোল্লা।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নতুন টাকা নিয়ে রাজধানীতে প্রকাশ্যে বসছে জমজমাট নতুন ‘টাকার হাট’। এখন নেশাখোরদের জন্য টাকার বান্ডিল সরবরাহ করছেন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। ২ ও ৫ টাকার নোট তারা বিক্রি করছেন এর থেকে বেশি দামে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগের নাম ভাঙিয়ে বাংলাদেশের টাকা ভারতে বিক্রি করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিএ নেতারা।

গত ১৫ নভেম্বর যশোর বেনাপোলে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকার ২ ও ৫ টাকার নোট জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর মধ্যে ২ টাকার নতুন নোটের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার পিস। ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা অফিসের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক হুমায়ন কবীর মোল্লা বিনিয়ম মূল্য দিয়ে এই পরিমাণ ২ টাকার নতুন নোট কাউন্টার থেকে নেন। একজন কর্মচারী বা কর্মকর্তা এই পরিমাণ নোট সরাসরি নিতে পারেন না। তাকে ওই নোট দেওয়ার জন্য সুপারিশ (স্লিপ) করেন ওই অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার। বেনাপোল বন্দরে ধরাপড়া ৫০ হাজার পিস ২ টাকার নতুন নোট হুমায়ন কবীর মোল্লার নেওয়া কিনা তা দেখতে ২০ নভেম্বর তদন্ত শুরু করে খুলনা অফিস। ওই অফিসের একজন জিএমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি ঘটনাটি তদন্ত করছে। কিন্তু সেই তদন্তে হুমায়ন কবীর মোল্লা বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত অব্যাহত রাখলে অফিসপ্রধানদের বদলির জন্য আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন সিবিএ নেতারা। টাকাপাচারের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে খুলনা অফিস। তবে প্রধান কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, সীমান্তে কিছু নোট ধরা পড়ছে বলে শুনেছি। জব্দ করা টাকা আমাদের কাছে এলে বুঝতে পারব এটি কোন অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও নতুন নোট দেওয়া হয়। জব্দ করা টাকার বিষয়ে কার কাছ থেকে গেছে, সেটি আমাদের কাছে না এলে বলা যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল হক বলেন, হুমায়ন কবীর মোল্লা কাউন্টার থেকে টাকা নিয়েছেন। কিন্তু তিনি তো পাচার করেননি। আমরা বলেছিÑ তদন্ত করেন, যদি সেটি তার নেওয়া টাকা হয়, তা হলে ব্যবস্থা নেন। এ ছাড়া তিনি যদি কোনো প্রকার চাপ দিয়ে বেশি টাকা নিয়ে থাকেন, সেটিও বের করেন। হুমায়ন কবীর মোল্লা দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আমরাও ব্যবস্থা নেব।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টাকা বেচাকেনা নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এবং গুলিস্তানে প্রকাশ্যে জমজমাট ‘টাকার বাজার’ রয়েছে। এসব ‘বাজারে’ টাকা সরবরাহ করছেন সিবিএ নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা। এসব বিষয় জানার পরও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র জানায়, ভারতের ইয়াবাসেবীদের কাছে বাংলাদেশের ২ টাকার ব্যাপক চাহিদা। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে দুই টাকার নোট পাচার হচ্ছে। এতে বিনিময়মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ পাচ্ছেন পাচারকারীরা। ভারতের হিরোইনসেবীদের কাছেও ২ ও ৫ টাকার নোটের চাহিদা ব্যাপক হওয়ায় এর পাচার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। নোট পাচারের ঘটনায় যশোর বেনাপোল পোর্ট থানায় চারটি মামলা দায়ের হয়েছে।

বাংলাদেশি সাধারণ নাগরিকরা নতুন নোটের বান্ডিল ব্যাংক থেকে নিতে পারেন না। বছরে দুই ঈদের সময় স্বল্পপরিমাণ নতুন নোট ব্যাংক থেকে বিনিময় করে নেওয়া যায়। এর বাইরে অন্য কোনো সময় নতুন নোট নেওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ নতুন নোট না পেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে এবং গুলিস্তানের ‘নোটের বাজার’ থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

আমাদের সময়ের বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, গত দেড় বছরে অন্তত তিনবার পাচারকালে এই নোট জব্দ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ নভেম্বর বেনাপোল চেকপোস্ট নোম্যান্সল্যান্ড এলাকা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকার বাংলাদেশি ২ ও ৫ টাকার নতুন নোট জব্দ করে বিজিবি। তবে এ সময় পাচারকারীদের কেউ আটক হয়নি। এর আগে ৩ নভেম্বর ২ টাকা মূল্যমানের ২৬ হাজার টাকার নতুন নোট জব্দ করে বিজিবি। ওই ঘটনায় মোহাম্মদ নাসিম নামে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করা হয়। এর আগে ২৩ অক্টোবর আটক করা হয় ৪০ হাজার টাকা (২ টাকার নোট)। ওই সময়ও কাউকে আটক করতে পারেনি বিজিবি।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, হুমায়ন কবীর মোল্লা সিনিয়র কেয়ারটেকার পদে কর্মরত। তার বাড়ি খুলনার তেরখাদায়। তিনি সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমানের গ্রুপে রাজনীতি করেন। রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবে তার কাছে খুলনা অফিসের কর্মকর্তারা অনেকটা অসহায়। তার বিরুদ্ধে ওভারটাইম, প্রভাব খাটিয়ে কর্মচারীদের বদলিতে অর্থগ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ঝামেলা এড়ানোর জন্য কোনো কর্মকর্তাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান না। ছোট কর্মচারী হলেও হয়রানির ভয়ে তাকে অন্যত্র বদলি করার সাহসও দেখান না কর্মকর্তারা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে