গ্যাস নিয়ে চলছে লুটপাট

  লুৎফর রহমান কাকন

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৬:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে একদিকে যখন ভয়াবহ গ্যাস সংকট, অন্যদিকে তখন চলছে চরম লুটপাট। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করতে পারেনি সরকার। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় ঠিকাদার ও প্রভাবশালী নেতাকর্মীরা মিলে অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এমনকি স্থানীয় সিন্ডিকেট মানুষের কাছ থেকে প্রতিমাসে আদায় করছে গ্যাস বিলও। অবৈধভাবে কী পরিমাণ গ্যাস পুড়ছেÑ তার সঠিক কোনো হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছেও। একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, আর্থিক অঙ্কে প্রতিমাসেই তা শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সূত্রে জানা যায়, শিল্প, আবাসিকসহ সব ধরনের গ্রাহকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ গ্যাস নিয়ে এখন চলছে মহাহরিলুট। প্রায় দুই বছর আগে জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও পাইপলাইন অপসারণ কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হলেও বস্তুত এই কমিটির কার্যক্রম শুধু বৈঠক আয়োজন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এখনো ব্যাপক আকারে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কাজ চালাতে পারেনি।

সর্বশেষ জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জ্বালানি বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এ কমিটির বৈঠক হয়। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কার্যক্রমের কচ্ছপগতির কারণে বৈঠকে হতাশা ব্যক্ত করে তা আরও গতিশীল করতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের শাস্তির বিষয়ে পোস্টারিং করা, পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা; বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করার পাশাপাশি অবৈধ সংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; গ্যাস কোম্পানির ভিজিল্যান্স টিমের শিল্পগ্রাহকদের আঙ্গিনায় আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা; বিশেষ করে অবৈধ গ্যাস রয়েছে এমন বৃহৎ এলাকা চিহ্নিত করে মেইন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া; অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা করা।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আমাদের সময়কে বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে গেছে সত্যি। তবে এগুলো উচ্ছেদের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমাদের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়তই অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। ক্রমান্বয়ে কমে আসছে অবৈধ গ্যাস ব্যবহার।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর ধরে সরকার ঘোষণা দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ রুখতে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদ করতে নামলেও তেমন সফলতা নেই। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৯ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এখনো শুধু তিতাস গ্যাস বিতরণ এলাকাতেই রয়ে গেছে প্রায় ৩৪৫ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগ। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বাইরে দেশে আরও ৫টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি রয়েছেÑ বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ও সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। তাদের আওতাধীন এলাকায় কী পরিমাণ অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে, সেই হিসাব নেই কোনো কোম্পানির কাছেই।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়Ñ ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী ও ময়মনসিংহ এলাকাজুড়ে শুধু আবাসিক গ্রাহকদের অবৈধ গ্যাস-সংযোগ আছে ৩৪৫ কিলোমিটার। প্রায় ৩১৫টি স্পট চিহ্নিত করেছে তিতাস গ্যাস। এসব এলাকা থেকে মাত্র ২০টি স্পটে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ১৯ কিলোমিটার অবৈধ লাইন তুলে ফেলা হয়েছে। গ্রাহকদের প্রায় ৯ হাজার ৫৩০টি চুলার বার্নার অপসারণ করা হয়েছে।

এদিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে একদিকে যখন চলছে তেলেসমাতি কা-, তখন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, তাদের নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তবে এত কিছুর মধ্যেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও ক্যাপটিভসহ ৪৩টি সংযোগ তিনি বিচ্ছিন্ন করেছেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক সভায় জানিয়েছেন, তার জেলায় কোথাও কোথাও অবৈধ গ্যাস সংযোগের পরিমাণ ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত রয়েছে। গ্যাস কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদাররা এসব সংযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তিনি বলেন, ফতুল্লা এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল হিসেবে টাকা আদায় করছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সিন্ডিকেট। ফলে একদিকে গ্যাস পুড়ছে অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বৈঠকে একই অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় ঠিকাদাররা গ্যাস বিলের টাকা সংগ্রহের জন্য ভুয়া বই বিলি করে থাকেন। এতে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতারিত হচ্ছেন।

উল্লেখ্য, প্রায় এক বছর আগে সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে সরকারের শীর্ষমহলে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন। সেখানে উল্লেখ আছে সরকারদলীয় প্রভাবশালী স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঢাকা তার আশপাশের এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব আমাদের সময়কে বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীরা এমনভাবে জড়িয়ে গেছেন যে, এখন চাইলেও গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারছেন না। বিভিন্ন দিক থেকে রাজনৈতিক চাপ আসে। ওই কর্মকর্তা বলেন, কোনো কোনো সংসদ সদস্যও অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের বৈধ করে নেওয়ার জন্য জ্বালানি বিভাগকে চাপ দিচ্ছেন।

এদিকে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদের অতিরিক্ত সচিব (আইন) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, গ্যাস জাতীয় সম্পদ। এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন অবৈধ গ্যাস সংযোগের সঙ্গে কেউ একা দায়ী নয়। তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা কর্মচারী ও ঠিকাদাররা জড়িত।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মীর মশিউর রহমান বলেন, দুবছর আগের তুলনায় এখন অবৈধ সংযোগ দেওয়ার পরিমাণ অনেক কমে আসছে। তিনি বলেন, তিতাসের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে