বড় দুদলে যোগ্য প্রার্থী সংকট

  প্রদীপ মোহন্ত, আব্দুল্লাহ প্রিন্স, অরুন সরকার, বগুড়া

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ্য প্রার্থীর সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে দুই দলের জন্যই এ আসনে প্রার্থী নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। এ কারণেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তোড়জোড় সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, অতীতের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে ভুলের কারণে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়েছে।

অতি সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলটির প্রবীণ নেতা আদমদীঘি উপজেলা সভাপতি আনছার আলী মৃধা মারা গেছেন। অন্যদিকে বারবার বিএনপির দখলে থাকা এ আসনে শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য বিনাভোটে নির্বাচিত হয় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম তালুকদার। নিজের দলেই তিনি গ্রহণযোগ্যতার সংকটে রয়েছেন। তিন দলের এমন পরিস্থিতির কারণে অনেকেরই নজর এখন এই আসনের দিকে। প্রধান দুই দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতারা মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়ে মাঠে নেমেছেন। তবে সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, তারা যোগ্য প্রার্থী চায়। সেটি যে দলেরই হোক। দল প্রার্থী মনোনয়নে ভুল করলে তারা প্রতীক বিবেচনা করবে না।

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলায় মোট ভোটার দুই লাখ ৮৪ হাজার ৮১৫ জন। এর মধ্যে আদমদীঘিতে এক লাখ ৫২ হাজার ২৪৩ জন ও দুপচাঁচিয়ায় এক লাখ ৩২ হাজার ৫৭২ জন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে কছিম উদ্দিন এমপি নির্বাচিত হন। এর পর আওয়ামী লীগের কেউই এমপি হতে পারেননি। এর পর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল মজিদ তালুকদার, ১৯৮৬ সালে জাসদের প্রার্থী হিসেবে ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এবিএম শাহজাহান, ১৯৯১ সালের বিএনপির আবদুল মজিদ তালুকদার, ১৯৯৬ সালে বিএনপির মেজর জেনারেল (অব) গোলাম মাওলা, ১৯৯৬ সালে বিএনপির আবদুল মজিদ তালুকদার, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির আলহাজ নুরুল ইসলাম তালুকদার।

২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন ভুলের কারণে আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয় আসনটি। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা এক লাখ চার হাজার ৬২২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনছার আলী মৃধা। তিনি ভোট পান ৮৪ হাজার ২৭৬ ভোট। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব) গোলাম মাওলা ২৩ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে জামানত হারান। আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর ভোট একসঙ্গে যোগ করলে দাঁড়ায় এক লাখ আট হাজার ২৭১। সে হিসাবে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার কথা। স্থানীয়দের মতে, ওই নির্বাচনে গোলাম মাওলাকে বাদ দিয়ে আনছার আলী মৃধাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেই আওয়ামী লীগই বিজয়ী হতো।

তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবার জোটের শরিককে এ আসনটি ছাড় দিতে নারাজ। আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসনটি পুনর্দখলের পরিকল্পনা বিএনপির।

এ আসনে বিএনপির রাজনীতির কর্ণধার দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা। তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ২০০১ ও ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা হয়েছে তার নামে। পরোয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি পলাতক বহুদিন ধরে। তাকে নিয়ে হাইকমান্ডও চরম বিব্রত। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ অনেকটাই অনিশ্চিত। খোকার অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশ কয়েকজন নেতা এখন মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তরুণ রাজনীতিক হামিদুল হক চৌধুরী হিরু, আদমদীঘি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মুহিত তালুকদার, জেলা শ্রমিক দলের প্রধান উপদেষ্টা সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, জেলা বার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান মুক্তা, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বগুড়া ইউনিটের সভাপতি শেখ মোকলেছুর রহমান।

তবে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত হামিদুল হক চৌধুরী হিরু এগিয়ে আছেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তরুণ এ নেতা নির্বাচনী প্রচারে মাঠে রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকছেন। দুস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা করছেন। একই কারণে এলাকার মানুষের দৃষ্টিতে অন্যদের চেয়ে হিরু এগিয়ে বলে জানিয়েছেন তারা। এর আগে তিনি দুপচাঁচিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনেও প্রার্থী ছিলেন।

হিরু বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রার্থীর পরিবর্তন চান। তা ছাড়া দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাঠে আছি। সাধ্যমতো চেষ্টা করছি দলের হয়ে কাজ করার।

আদমদীঘি উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মুহিত তালুকদার আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে জানান, মোমেন তালুকদার ভোটে অংশ নিতে না পারলে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান তিনি। এ ক্ষেত্রে দলের মনোনয়নও চাইবেন তিনি।

অ্যাডভোকেট শেখ মোখলেছুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন। এলাকাবাসীর পরামর্শেই প্রার্থিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান মুক্তাও জনকল্যাণের লক্ষ্যে নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। নিজেকে বিএনপির একনিষ্ঠ কর্মী বলে মনে করেন তিনি। তাই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী ব্যবসায়ী সুলতান মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিএনপির মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আনছার আলী মৃধা বেঁচে নেই, সে কারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি তৃণমূলের পছন্দমতো প্রার্থী মনোনয়ন দেয় তা হলে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগকে হারানো সম্ভব নয়। কারণ অতীতের চাইতে বর্তমানে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে দলটি।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা হলেন আদমদীঘি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম খান রাজু, বগুড়ার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল মতিন, দুপচাঁচিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান খান সেলিম, আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক অজয় কুমার সরকার।

সিরাজুল ইসলাম খান রাজুর জনসমর্থন এলাকায় বেশি। প্রবীণ এ নেতা জনগণের কাছে দেশের উন্নয়নের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরছেন এবং নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। তিনি বলেন, ২৫ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম। উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছি। এসব অভিজ্ঞতা বড় পরিসরে প্রয়োগ করতে এমপি পদে প্রার্থী হতে চান।

মিজানুর রহমান খান সেলিম তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সমর্থন পেয়ে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে জানান।

অ্যাডভোকেট আবদুল মতিনও নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হতে চান। জেলা আওয়ামী লীগের এ সহসভাপতি বলেন, এলাকার উন্নয়ন করার লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নিতে চাই।

বর্তমান এমপি নুরুল ইসলাম আগামীবারও প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও স্থানীয় রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি তেমনভাবে সক্রিয় নয়। তার নিজের দলের নেতাকর্মীরাই অভিযোগ করে বলেছেন, বিনাভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি শুধু নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। দল ও মাঠের কর্মীদের সময় দেন না। এ কারণে নিজ দলেই এ নেতা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। তবে এমপি নুরুল ইসলামের দাবি, নির্বাচিত হয়ে তিনি এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন। আগামীতেও সুযোগ পেলে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবেনÑ এমনটাই প্রতিশ্রুতি তার। তিনি ছাড়া এ আসনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ড. অ্যাডভোকেট সামছুর রহমান, জেলা জাপার যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুর রহমান তৌহিদ প্রার্থী হতে আগ্রহী।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে