ভাষাবিপাকে ভারতে পাচার ৯ হাজার বাংলাদেশি

  হাসান আল জাভেদ

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরি বা বিভিন্ন কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করা ৯ হাজার ৪৬৩ শিশু ও নারীর একটি তালিকা ঢাকাকে দিয়েছে নয়াদিল্লি। এই নারী ও শিশুরা বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের আশ্রয়কেন্দ্রে আছে। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশসহ নানারকম বিধিভঙ্গের কারণে মামলা রয়েছে। কিন্তু ভারতের একেক রাজ্যে একেক ভাষায় মামলাগুলো করায় সেগুলো ঠিকঠাক মোকাবিলা করতে পারছে না পাচার হওয়া নারী ও শিশুরা। উপরন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের মুখের ভাষা বুঝতে না পেরে মামলায় ভুলভাল তথ্য তুলে দিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। ফলে কঠিন এক ফাঁদে পড়েছে এসব শিশু ও নারী। কবে তাদের মামলা শেষ হবে, কবে তারা মুক্তি পাবে আশ্রয়কেন্দ্রের মানবেতর জীবনযাপন থেকে, তা কেউ বলতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছে, ভারতও চাইছে পাচার হওয়া বাংলাদেশিদের ফেরত দিতে। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না বহু ভাষার কারণে।

পাচার হওয়া ৯ হাজার ৪৬৩ বাংলাদেশি নারী ও শিশুর দেওয়া তালিকায় উল্লিখিত নাম-ঠিকানা ধরে এ দেশে তাদের স্বজনদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি পাচারকারী দালাল চক্রকে শনাক্ত করতে মাঠে নামে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)। কিন্তু গোয়েন্দা তদন্তে ভারতের দেওয়া তালিকার মধ্যে ২ হাজার ১৭০ জনের সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি।

ঢাকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও উদ্ধারকৃত ভুক্তভোগীদের স্বদেশ প্রত্যাবাসনসহ মানবপাচারসংক্রান্ত উদ্ভূত ইস্যু নিষ্পত্তিতে ২০০৯ সালে টাস্কফোর্স গঠিত হয়। ২০১৫ সালের ১৭-১৮ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের টাস্কফোর্স সভার আলোকে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এর পর ভারত থেকে ওই তালিকা দেওয়া হয়। গত ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে ষষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়ায় আগামী মাসের মাঝামাঝি ওই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে পাচারকৃতদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে কাজ করছে কয়েকটি এনজিও। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী’ ও ‘রাইটস যশোর’ উল্লেখযোগ্য।

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক আমাদের সময়কে বলেন, ভারতে পাচার হয়ে গেলেও দেশটির আইন অনুযায়ী অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের মামলা দায়ের হয়। পাচার হওয়া ব্যক্তির সাজাও হয়। আমরা এসব ভুক্তভোগীকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে চাই। কিন্তু ভারতে একাধিক ভাষা থাকায় আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাষাগত জটিলতা দূর করার জন্য আমরা আন্ডার টেকেন দিয়ে এসব ভুক্তভোগীকে দেশে ফিরিয়ে এনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রস্তাব করেছি। কারণ এরা তো অপরাধী নয়, যে পালিয়ে যাবে।

বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, পাচারকৃত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনায় জটিলতা হচ্ছেÑ আন্ডার টেকেন দিয়ে তাদের ছাড়ানোর অনুমতি পেলেও স্বল্প সময়ে তা সম্ভব হচ্ছে না। আবার দীর্ঘ সময় ধরে হাজিরা দিতে হচ্ছে। দ্রুত সময়ে বিচারিক কার্যক্রম হলে এতগুলো মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। এ ছাড়া ভারতে যৌন নির্যাতিতদের দেশটির সরকার ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ প্রদান করে। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) মো. শামসুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ভারতে পাচার হয়ে যেমন বাংলাদেশি নাগরিকরা আটকা পড়ে আছেন, তেমনি বাংলাদেশেও ভারতীয় নাগরিকরা রয়েছেন। আমাদের মতো তারাও নিজ দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবাসন চান। এ নিয়ে মার্চ মাসে টাস্কফোর্সের ষষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি এতে একটি ভালো ফল আসবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গাজীপুরে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির শেল্টার হোমে ভারতীয় নাগরিকরা রয়েছেন। নিয়মিত উভয় দেশের শেল্টার হোম পরিদর্শন করা হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনে বেনাপোল সীমান্তের শার্শার কাগজপুর গ্রামে বাংলাদেশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত একটি কমিউনিটি সেন্টারকে ‘ট্রানজিট শেল্টার হোম’ হিসেবে রূপান্তরের কার্যক্রমও চলছে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে ভারতে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সহজতর করার ওপর।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার (মানবপাচার প্রতিরোধ) দ্বীপ্তি বল বলেন, ভারতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৫-৬ মাস পর পর একটি মামলার তারিখ পড়ে। আবার নির্দিষ্ট তারিখে দেখা গেছে বিচারক থাকেন না। এতে করে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয় মামলায়। অন্যদিকে নিয়ম ছাড়াই কিছু বাংলাদেশিকে সীমান্তে পুশব্যাক করে দেওয়া হয়। এতে তালিকাতেও গরমিল হয়। বিচারপ্রক্রিয়া সহজতর করার ওপর জোর দেন তিনি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে